সরকার গঠনের তিন মাসের মাথায় ১৩ জুন পর্যটন নগরী কক্সবাজারে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ষষ্ঠবারের মতো তিনি কক্সবাজার আসছেন। ১৯৮৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে প্রথমবার কক্সবাজার আসেন তিনি। এরপর ১৯৯৭ সালে দুইদিন পারিবারিক সফরে কক্সবাজার অবস্থান করেন। সে সময় তিনি হোটেল শৈবালে রাত্রি যাপন করেন। এরপর ২০০৩ সালে হোটেল সী গালে অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপি সম্মেলন ও কাউন্সিলে যোগদান করেন। এরপর ২০০৫ সালের কক্সবাজার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত তৃণমূল বিএনপি'র প্রতিনিধি সভায় যোগদেন। পরের বছর ২০০৬ সালে হোটেল সী গালে অনুষ্ঠিত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মিলনমেলায় যোগদান করেন।
তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে নতুন করে সাজছে পর্যটন রাজধান কক্সবাজার। জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অঙ্গ সংগঠন, জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সমুদ্র নগরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কক্সবাজারবাসী। ইতিমধ্যে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে দরিয়া নগরবাসীর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে দাবি আদায়ের আয়না হিসেবে। কক্সবাজার রামু ও ঈদগাও আসনের সাংসদ লুৎফর রহমান কাজল গতকাল ৯ জুন বিকালে নিজ বাসভবনে তিন উপজেলার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন করেছেন। দিয়েছেন নানান দিকনির্দেশনা। এছাড়া জেলা প্রশাসকের শহীদ এটিএম জাফর আলম মিলনায়তনে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন করেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ১৩ জুন কক্সবাজার সফরে আসছেন। সেটা নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার ১ - মোহাম্মদ উজ্জল হোসেন। প্রটোকল অফিসারের স্বাক্ষরকৃত সংশোধিত সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৩ জুন শনিবার দিনব্যাপী কক্সবাজার সফর করবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সফরসূচী মতে এদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক অনুষ্ঠান এবং জনসভায় অংশ নেবেন।
সকাল ৮টায় ঢাকার বাসভবন থেকে রওনা হয়ে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন এবং সেখান থেকে বিমানযোগে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছে প্রথমেই পিএমখালী ইউনিয়নের পাতলী খাল পুনঃখনন প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। সেখানে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও পথসভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
পরে তিনি চকরিয়ার ডুলহাজারা সাফারি পার্কে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন এবং পার্ক পরিদর্শন করবেন। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মো. ওয়াসিমের কবর জিয়ারত ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী নবগঠিত মাতারবাড়ী উপজেলা এবং পেকুয়া পৌরসভার প্রশাসনিক বিভাগের উদ্বোধন করবেন। বিকেলে চকরিয়ায় আয়োজিত রাজনৈতিক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
সন্ধ্যায় চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন এবং সমুদ্র সৈকত এলাকা পরিদর্শনের পর রাত ৮টায় লবণ ফেস্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন এবং রাত ১০টায় ঢাকার উদ্দেশে বিমানযোগে যাত্রা করবেন। রাত ১১টার দিকে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার জেলায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সফর উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে তাঁর প্রথম কক্সবাজার সফর। এ সফরকে ঘিরে জেলাজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে কক্সবাজারবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। জেলার উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিভিন্ন মহল থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পারদ তুঙ্গেে। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে গেছে দাবি-দাওয়ার ফুলঝুরিতে। তবে প্রতিটি দাবি বর্তমান সময়ের সাথে প্রয়োজনতার নিরিখে বাস্তবসম্মত বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ বদরী। এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন রামু সদর ঈদগাও আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজলও।
সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল বলেন- প্রধানমন্ত্রীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কক্সবাজার শহরকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন নগরী হিসেবে ঘোষণা এবং সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে রূপান্তর, কক্সবাজার সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং সকল বিভাগে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা ও কক্সবাজার- চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্রুত চারলেনে উন্নীতকরণ, কক্সবাজার থেকে মহেশখালী পর্যন্ত সেতু নির্মাণ, পিএমখালীর পাতলী খালকে শহীদ জিয়া স্মৃতি খাল হিসেবে নামকরণ, কক্সবাজার স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণ অর্ধশত দাবি রয়েছে।
এছাড়াও ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতকে বিশ্ব পর্যটনের জন্য আরও উন্মুক্ত ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা, মহেশখালী-কক্সবাজার সহজ যোগাযোগের জন্য সেতু নির্মাণ, বাঁকখালী নদী-তে ড্রেজিং, সোনাদিয়া দ্বীপ-কে বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক্সক্লুসিভ জোন হিসেবে গড়ে তোলা এবং মহেশখালী-মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও জানিয়েছেন জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মোঃ ইউসুফ বদরী।
অপরদিকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এখানে গ্যাস লাইন স্থাপনের দীর্ঘদিনের দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থনৈতিক ও পর্যটনখাতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের মানুষ এখনো এ মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের এ যৌক্তিক দাবি পূরণ হবে বলে জেলাবাসী আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মীর উৎপাত সীমাহীন বেড়েগেছে। এই উৎপাত কঠোর হস্তে দমন করা সীমান্ত জনপদের মানুষের দাবী।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত নানা সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। স্থানীয় জনগণ নানা সীমাবদ্ধতা ও চাপের মধ্যে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসলেও এই সংকটের একটি দ্রুত, কার্যকর ও টেকসই সমাধান এখন সময়ের দাবি। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছেন জেলাবাসী।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান ১৩ জুন সকাল দশটায় কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে সরাসরি পিএম খালিতে ১৯৭৯ সালের ৪ ডিসেম্বর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে খননকৃত পাতলী খালের পুন:খনন কাজের উদ্বোধন করবেন এবং সংক্ষিপ্ত পথ সভাই বক্তব্য রাখবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে পিএম হালিতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক মোঃ আ: মন্নান এবং পুলিশ সুপার আ ন ম সাজেদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন পাতলী খালের খনন কাজের জন্য বাছাইকৃত স্থান পরিদর্শন করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে উক্ত স্থানে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন সংসদ লুৎফর রহমান কাজল। তিনি স্থানীয় নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি সভা ও সম্পন্ন করেছেন। পরিশেষে বলা যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দরিয়া নগরে আথিয়েতা দিতে প্রস্তুত কক্সবাজারবাসী।