বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর মাত্র দুই বছরের মধ্যেই লাভজনক রুটে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। বর্তমানে চার জোড়া ট্রেনের মাধ্যমে প্রতি মাসে কয়েক লাখ যাত্রী পরিবহন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পর্যটননির্ভর এ রুটে দিন দিন যাত্রী চাহিদা বাড়তে থাকায় ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। আগামী বছরের মধ্যে নতুন আরও কয়েকটি ট্রেন চালু করা সম্ভব হলে প্রতি মাসে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
এরই মধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রাপথ কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। চলতি মাসেই নতুন এ সেবা চালুর আশা করছে রেলওয়ে।
বাড়ছে যাত্রী, বাড়ছে চাপ
পর্যটকদের ব্যাপক আগ্রহ এবং অতিরিক্ত যাত্রী চাপ সামাল দিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে বর্তমানে চলছে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস। বিরতিহীন এ দুই আন্তঃনগর ট্রেনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে প্রবাল ও সৈকত নামে আরও দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন। প্রতিদিন এসব ট্রেনে কয়েক হাজার যাত্রী যাতায়াত করছেন। তারপরও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে যাত্রী চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলকে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার জয়নাল আবেদীন জানান, শুধু কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন থেকেই ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৭২২টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। এসব টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫৯ কোটি ৪ লাখ ২ হাজার ২৬৫ টাকা।
মাসভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ৮৪ হাজার ৫১৭টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ ২২ হাজার ৮৩০ টাকা। আগস্টে ৮৪ হাজার ৫৪টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ২৬০ টাকা। সেপ্টেম্বরে ৯০ হাজার ৩৩০টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ১৮ হাজার ৬৭ টাকা।
অক্টোবরে ৮৬ হাজার ৭৯৭টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার ১৪০ টাকা। নভেম্বরে ৮১ হাজার ৩৩৮টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ২৫ হাজার ২৯২ টাকা। ডিসেম্বরে ৯৬ হাজার ৮৭০টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭২ টাকা।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮৯ হাজার ১৯৩টি টিকিটে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ২১৮ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৫০ হাজার ৮৫৬টি টিকিটে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার ২৬৬ টাকা। মার্চে ৮০ হাজার ১৭টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯১ লাখ ৮৮ হাজার ৫০৪ টাকা।
এপ্রিলে ৮২ হাজার ৪টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৩৪৫ টাকা। মে মাসে ৭৮ হাজার ৬০৬টি টিকিটে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৭১৩ টাকা। জুনে ৮৫ হাজার ১৪০টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ২৬ লাখ ২১ হাজার ৯৫৮ টাকা।
কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ছে আরও ট্রেন
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া বলেন, ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে বর্তমানে যেসব ট্রেন চলাচল করছে, সেগুলোর পাশাপাশি আরও কয়েকটি ট্রেন কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের বাড়তি চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ করা সম্ভব হবে।
এ অবস্থায় পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এ রুটে নতুন আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসা মহানগর এক্সপ্রেসের শেষ গন্তব্য চট্টগ্রামের পরিবর্তে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, ঢাকা থেকে চলাচলকারী আরও একটি ট্রেন কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এ জন্য ট্রেনের কোচ ও ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এগুলো পাওয়া গেলে পর্যাপ্তসংখ্যক ট্রেনের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সহজে কক্সবাজার যাতায়াত করতে পারেন।
সড়কের চেয়ে দ্রুত ও নিরাপদ রেল
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কপথে ১৫৯ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা। বিপরীতে ১৫১ কিলোমিটার রেলপথে যেতে সময় লাগে মাত্র প্রায় ৩ ঘণ্টা। একই সঙ্গে সড়কপথের বিপজ্জনক বাঁক এড়িয়ে রেলপথে তুলনামূলক নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ থাকায় এ রুটে আরও ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, রেলপথকে কার্যকর করতে হলে রেলসেবার পরিধি ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো গেলে সড়কপথে দুর্ঘটনা কমানো এবং প্রাণহানি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
মাসে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য
রেলওয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দুটি বিরতিহীন ও দুটি লোকাল ট্রেনের মাধ্যমে প্রতি মাসে কক্সবাজার রুটে কয়েক লাখ যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। মহানগর এক্সপ্রেস যুক্ত হলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এরপর আগামী বছরের মধ্যে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে প্রতি মাসে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, আগামী বছরের মধ্যে কক্সবাজার রুটে আরও ট্রেন বাড়ানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে।
পাঁচ জোড়া ট্রেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা
গত ১ আগস্ট কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন ও কক্সবাজার-দোহাজারী রেলপথ পরিদর্শন করেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ সময় তিনি জানান, কক্সবাজার রুটে ট্রেন সেবা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এ রুটে চার জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করছে। এ সংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচ জোড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি বলেন, কক্সবাজার সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। চলতি মাসের মধ্যেই আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী মহানগর ট্রেনটি শিগগিরই কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে এবং এটিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ট্রেনে রূপান্তর করা হবে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ভবিষ্যতে কক্সবাজার রুটে রেলসেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রেলপথের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় লোকোমোটিভের কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত করে এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, জনগণের চাহিদার কথা বিবেচনা করে রেলসেবা আরও বাড়ানো হবে। প্রধানমন্ত্রীও রেলসেবার পরিধি ও মানোন্নয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করছে সরকার।
রাজস্ব আদায়ে নতুন সম্ভাবনা
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই কক্সবাজার রেলপথে যাত্রীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে এ রুট থেকে ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল।
ঢাকা-চট্টগ্রামের পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথও এখন দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেল রুটে পরিণত হচ্ছে। যাত্রী চাহিদা, পর্যটন সম্ভাবনা এবং সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন ট্রেন যুক্ত হলে কক্সবাজারের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও সহজ ও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।