সাগরপাড়ের কিনারে ৩ টি আবাসিক রিসোর্ট এবং একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়েই আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের আড়াই শত থেকে ৩ শত সদস্য অবস্থান করে তৈরি করা হয়েছিল গোপন আস্তানা। যেখানে ৬ টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ ও একটি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করেছিলেন তারা। ভাড়া নেয়ার পর ভবনটির পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন বিদেশীরা। যার জন্য প্রতিষ্ঠানের জনবল ও ব্যবস্থাপনা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে ছিলেন।
আর এই পুরো বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছিল গত ২৫ আগস্ট পুলিশের প্রথম অভিযানের আগেই। যেখানে অভিযান টের পেয়ে এসব বিদেশীরা কৌশলে পালিয়ে গিয়েছিল। যার সূত্র ধরে গত ২৬ আগস্ট ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এবং ২৮ আগস্ট ডিআইজি, সিটিটিসির নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করে।
এরপরই সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব, অসংখ্য আইফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ঘিরে তদন্ত শুরু হয়। আর সেই তদন্তে প্রকাশ্যে আসে এসব বিদেশীরা মুলত আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণার সাথে জড়িত।
যে চক্রটি ৭ ধরণের অনলাইন প্রতারণায় জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। যেগুলো হল, কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন, ক্লোন/ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ জমা নেওয়া, এক্সিট ফ্রড, অর্থ আত্মসাৎ, বিভিন্ন ধরনের অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণা।
যে তদন্তের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার প্যালকন ও সি-প্যালেস হোটেলে অবস্থান করা ৬ জনকে আটক করে। যার মধ্যে ৫ জন চীন এবং ১ জন তাইওয়ান নাগরিক।
ইতিমধ্যে আটকদের শুক্রবার সন্ধ্যায় আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এ ব্যাপারে রামু থানায় দায়ের করা মামলার এজাহার, পুলিশের ৬-৭ কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের চমকপ্রদ এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
যদিও শনিবার বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কারভাবে কোন কথা বলতে রাজী হননি পুলিশের কোন কর্মকর্তা। শুধু কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) অহিদুর রহমান বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করে যাচ্ছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
তবে রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বাদি হয়ে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, আড়াই শত থেকে ৩ শত জনের চীন এবং তাইওয়ানের নাগরিক বাংলাদেশে আসেন মার্চ মাসে। এপ্রিল মাসে এসে মেরিন ড্রাইভের মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-বু রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স নামক আবাসিক ভবন ভাড়া নেন। রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার পর তারা নিজেদের মতো করে পুরোনো সেটআপ পরিবর্তন, নতুন ডেকোরেশন, নিরাপত্তাকর্মী ও জনবল নিয়োগসহ পুরো ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন।
এরপর রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব এবং ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বিপুলসংখ্যক পুরোনো মডেলের আইফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করা শুরু করে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন মতে, বিষয়টি এপ্রিল মাস থেকে পুলিশের নজরে আসলে নানাভাবে তদন্ত শুরু হয়। আইনমতে কোন বিদেশী আবাসিক হোটেলে অবস্থান করলে তাদের পার্সপোটের কপি সহ ডিএসবিকে অবহিত করার নিয়ম থাকলেও ৪ টি প্রতিষ্ঠানের মালিক এসব বিদেশীদের ভাড়া দেয়ার বিষয়টি পুরোটাই গোপন করেছেন।
যার প্রেক্ষিতে ডিএসবি হোটেল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদে হোটেলসমূহের কর্তৃপক্ষ জানান যে, একজন চীনের নাগরিক বাবর আলী নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ঝান ইউয়ান ফান এপ্রিল মাস থেকে হোটেলগুলো ভাড়া নেয়। এসব জানানো হয়, জিন শিন নির্মাণ কোম্পানি নামের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের কার্যক্রমের অংশ এটি। পরে ডিএসবি অনুসন্ধানে এ ধরনের কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ডিএসবি এ বিষয়ে এসব চীন ও তাইওয়ান নাগরিকদের সাথে আলাপও করেন। কিন্তু তারা তাদের বাংলাদেশে অবস্থানের বৈধতা, উদ্দেশ্য, যথাযথ ভিসা এবং বাংলাদেশে তারা কী কার্যক্রম পরিচালনা করছে এ বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেনি। তারা বাংলাদেশে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের কথা জানালেও এ বিষয়ে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
যার প্রেক্ষিতে পুলিশের একটি দল গত ২৫ আগস্ট এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান করলে চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের অনেকেই পেছনের সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওইদিন অভিযানের সময় রিসোর্টের একটি হলরুম থেকে বিভিন্ন মডেলের ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিউই, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস, ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া চীনা পুলিশের র্যাংক ব্যাজ, চীনের জাতীয় পতাকা এবং পুলিশ লোগোযুক্ত একটি টাই উদ্ধারের কথাও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া এসব আলামত পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজারের হেফাজতে রাখা হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে রিসোর্টটির ভিআইপি হল থেকে আলামতগুলো জব্দ তালিকামূলে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত চক্রটি কী ধরনের অনলাইন প্রতারণা চালাচ্ছিল, তা তদন্তাধীন। তবে সিটিটিসির একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে যে, তারা কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা, এক্সিট ফ্রড ও অর্থ আত্মসাতের মতো অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, কক্সবাজারে অবস্থান করে চক্রটি ইতোমধ্যে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ভুক্তভোগীর সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২৬ আগস্ট ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট পরিদর্শন করে। পরদিন ২৮ আগস্ট ডিআইজি, সিটিটিসির নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
বৃহস্পতিবার রাতে অভিযানে ৬ জনকে আটক করে এই মামলায় কারাগারে পাঠানো হলেও পুলিশের এজাহারে আরও ৪ জনের নাম উল্লেখ করে পালাতক দেখানো হয়েছে। যারা সকলেই চীনের নাগরিক।
এ ঘটনায় রামু থানা দায়ের করা মামলাটি সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২১, ২২, ২৪ ও ২৭ ধারায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান শুক্রবার বিকেলে জানিয়ে ছিলেন, এ চক্রের আরও সদস্য কক্সবাজারে অবস্থান করছে বলে তথ্য রয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের ব্যাপারে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।