মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী
# চালু হবে মাই ট্রি মনিটরিং অ্যাপ
# কমেছে এক লক্ষ হেক্টর বনভূমি
# রেললাইনে কাটা পড়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার গাছ
# প্রাইমারী স্কুলে চালু হবে “ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি” কর্মসূচি
সারাদেশে ৫ বছরে ২৫কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। এ বিশাল কর্মসূচীটি আজ শনিবার সকালে চকরিয়ার ডুলাহাজারাতে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি বিএনপি'র নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি।
সংশ্লিষ্ট সুত্র মতে, কক্সবাজারের মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ও ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে রেললাইন নির্মাণের কারণে কাটা পড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার গাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতির চলাচলের করিডোরও। এজন্য সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধনের জন্য কক্সবাজারকে বেচে নিয়েছে।
২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আজ শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচির যাত্রা শুরু হবে। এই কর্মসূচি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপে ২০২৬ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ গাছ লাগানো হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২০২৮ সালে লাগানো হবে ১৩ কোটি ৫০ লাখ গাছ। তৃতীয় ধাপে ২০২৯-২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১০ কোটি গাছ রোপণ করা হবে। বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাপদাহ, বায়ুদূষণ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পাহাড়ধস ও বন উজাড়ের মতো বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে দেশে বৃহৎ পরিসরে সবুজায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। এই বাস্তবতায় শুধু গাছ লাগানো নয়, এই কর্মসূচিকে “সবুজ বিপ্লব”, “সবুজ কর্মসংস্থান” এবং “প্রজন্মভিত্তিক পরিবেশ আন্দোলন” হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য চালু করা হবে ডিজিটাল “মাই ট্রি মনিটরিং” অ্যাপ, যার মাধ্যমে প্রতিটি গাছের অবস্থান, বৃদ্ধি ও পরিচর্যা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
উন্নয়ন প্রকল্প, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে গাছ নিধনের ফলে দেশের প্রাকৃতিক বনগুলো ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যও এ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
দেশে বনভূমি ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। বন অধিদপ্তরের সর্বশেষ বন সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে বন আচ্ছাদনের হার ছিল ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ১২ দশমিক ১১ শতাংশে। একই সময়ে প্রায় ১ লাখ হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে বনভূমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টরে, যা এক দশক আগেও ছিল ১৮ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর। কমেছে এক লক্ষ হেক্টর বনভূমি।
দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনাকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ১০ কোটি গাছ লাগানো হবে উপকূলীয় অঞ্চলে। নতুন জেগে ওঠা চর, অবক্ষয়িত উপকূলীয় বন ও মেঘনা মোহনার দ্বীপাঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ায় উপকূলীয় বনায়নকে প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও মধ্যাঞ্চলের অবক্ষয়িত শালবন পুনরুদ্ধারে লাগানো হবে ৫ কোটি গাছ। পাহাড়ি এলাকায় এই বনায়নের লক্ষ্য হবে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, ভূমিধস রোধ এবং জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। নগর অঞ্চলে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা কমাতে লাগানো হবে ১ কোটি ২৫ লাখ গাছ। পার্ক, ফুটপাত, খেলার মাঠ এবং সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলক “সবুজ পরিমাপক” মানদণ্ড ও “গ্রীণ বিল্ডিং সার্টিফিকেশন” চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার ধারে, রেলপথের পাশে, খালের পাড়ে ও নদীতীরে কমিউনিটিভিত্তিক বনায়নে লাগানো হবে ৩ কোটি ৭৫ লাখ গাছ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষি ও সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো হবে আরও ৩ কোটি ৭৫ লাখ গাছ।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর “ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি” কর্মসূচি চালু করে আগামী পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ গাছ এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আরও ২০ লাখ গাছ লাগানো হবে। ফলে বছরে মোট ১ কোটি করে পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ রোপণ সম্ভব হবে।