কক্সবাজার মহেশখালী উপজেলার পশ্চিমে সোনাদিয়া দ্বীপ। লাল কাঁকড়া, কাছিম ও বিরল প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত দ্বীপটির ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করেছে সরকার। ফলে আইন অনুযায়ী, সোনাদিয়ার মাটি, পানি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা বাণিজ্যিক রূপান্তর নিষিদ্ধ। তবে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গত আওয়ামী লীগ সরকার ১ হাজার ১ টাকার বিনিময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দেয়। যেখানে সবুজ প্যারাবনে ভর্তি ছিল দ্বীপের চারিপাশ।
২০১৭ সালের মে মাসে বেজা উপকূলীয় বন বিভাগের কাছ থেকে জমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু এরপর সেখানে ইকোট্যুরিজম প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি।
কিন্তু ২০২৬ সালের জুন মাসে এসে সেই প্যারাবনের অস্তিত্ব আর নেই। ১০ হাজার একর প্যারাবনের বাইন, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ উধাও হয়ে গেছে। নীরব সাক্ষী কেবল প্যারাবনের শুকনো শেকড়, বাগল, ডাল-পালা।
সরেজমিনে দেখা মিলে এমন ভয়াবহ দৃশ্য। মহেশখালী উপজেলার ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে পূর্ব ও পশ্চিমমুখী খাল ধরে সোনাদিয়ার দিকে এগোলে দুই পাশে চোখে পড়ে দীর্ঘ মাটির বাঁধ। দূর থেকে মনে হতে পারে নতুন কোনো সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু বাঁধের ভেতরে উঁকি দিলেই ভেসে ওঠে ভয়াবহ এক ধ্বংসযজ্ঞ। হাজার হাজার একর প্যারাবন কেটে তৈরি করা হয়েছে মাছের ঘের।
যেখানে দেখা পাওয়া স্থানীয় লোকজন জানান, ঘটিভাঙ্গা থেকে সোনাদিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ১০ হাজার একর প্যারাবন ধ্বংস করে তৈরি হয়েছে চিংড়ি ঘের। যেখানে মে মাস পর্যন্ত লবণের মাঠ ছিল।
দেখা যায়, খালের দুই পাশে মাটির উঁচু বাঁধ দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা। একসময় যেখানে ঘন কেওড়া, বাইন ও গর্জন জাতীয় গাছের প্যারাবন ছিল, সেখানে এখন সারি সারি ঘের। এই ১০ হাজার একর প্যারাবন নিধন করে কম হলেও এখন ১০০টি মাছের ঘের দেখা মিলেছে সেখানে।
স্থানীয়রা জানান, শুষ্ক মৌসুমে এসব জমিতে লবণ উৎপাদন করা হয়। বর্ষা এলেই একই জমি রূপ নেয় চিংড়ি ঘেরে। কোথাও কোথাও এখনো চলছে বাইন ও কেওড়া গাছ কাটা। কিছু এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার করতে গাছ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও দেখা গেছে।
কক্সবাজারের পরিবেশবাদি সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এর চেয়াম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক জানান, প্যারাবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক দেয়াল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করতে প্যারাবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন ধ্বংস হলে উপকূল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তিনি বলছেন, কেওড়া ও বাইন গাছ উপকূলীয় মাটি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এগুলো কেটে ফেললে ভূমিক্ষয় বাড়ে, খাল ও নদীতে পলি জমার ধরন বদলে যায় এবং জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও ধ্বংস হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূলে এমন বন উজাড় দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বন কেটে লবণ মাঠ বা চিংড়ি ঘের তৈরির সঙ্গে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের লোকজন জড়িত। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্নতা থাকলেও এ বিষয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা রয়েছে। ফলে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
যদিও এ ঘটনায় বনবিভাগের পক্ষে কয়েকটি মামলাও হয়েছে ইতিমধ্যে। যে মামলার এজাহারে দেখা যায়, জামায়াত নেতা আসামী ছৈয়দুল হক সিকদার এই মামলার ৮ নাম্বার আসামী। তিনি আবার ৭ নাম্বার আসামী মহেশখালী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল করিমের ভগ্নিপতি।
চিংড়ি ঘেরে দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রমিকরা বলছেন, সেখানে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল করিম জয়ের দুটি ঘের রয়েছে। তিনি সাজেদুল করিমের ছোট ভাই। যদিও আজিজুর করিম জয় মুঠোফোনে তার কোন ঘের থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
আবার জয় আর সাজেদুল করিমের চাচাতো ভাই আওয়ামীলীগ কর্মী জাহাঙ্গীরের একাধিক ঘের রয়েছে। আবার এদের আরেক চাচাতো ভাই রহমতুল্লাহর রয়েছে আলাদা ঘের। এই মামলার ৬নং আসামী মো: শমসের সাবেক আওয়ামীলীগের এমপি আশেক উল্লাহ রফিকের আপন ফুফাতো ভাই। শমসেরের ঘেরের পাশেই রয়েছে বিরাট একটি ঘের। এই মামলার ১১ নাম্বার আসামী কাইছার সিকদার বর্তমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুবক্কর ছিদ্দিক ও সাবেক মেয়র আওয়ামীলীগ নেতা মকছুদ মিয়ার ছোট ভাই। এই মামলার ৫ ও ৯ নাম্বার আসামী মোস্তফা আনোয়ার ও মহসিন আনোয়ার সাবেক উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মরহুম আনোয়ার পাশা চৌধুরীর ছেলে। এই মামলার ১৩ নাম্বার আসামী শাহেদ হচ্ছেন সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিনের ছোটভাই।
স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা তাদের স্থানীয় পেশি শক্তি ব্যবহার করে এখানে প্যারাবন কেটে লবনের মাঠ তৈরি করছেন। তাদের মধ্যে যুবলীগের সহ সাধারণ সম্পাদক ও কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল, কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিদ্দিক রিমন, জয়নাল মেম্বার ও একরাম মেম্বারসহ অনেকেই।
পরিবেশকর্মী রুহুল আমিন বলেন, এই মামলায় যারা আছেন বা যারা প্যারাবন কাটছে এদের মধ্যে আওয়ামীলীগ বিএনপি, জামাতসহ সর্বদলীয় লোকজন জড়িত। এই মামলায় আরো অনেক রাগববোয়াল বাদ গেছে। আর যাদের মামলা দিয়েছে তাদের অনেকেই ইতমধ্যে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে। উন্মুক্ত চলাফেরা করছে।
বনবিভাগের মহেশখারী গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন,আসলে এগুলো বেজার হাতে থাকাকালীনই বেশিরভাগ প্যারাবন কাটা হয়। বনবিভাগকে ৫হাজার একর জায়গা দিলেও এখনও আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। ঘের কেটে দেয়ার পক্ষে এখনো স্পষ্ট কোন ম্যাসেজ নাই। তবে এখানে একটা জিনিস বলে রাখি সেটা হচ্ছে এই ঘেরগুলো কেটে দেয়ার পরও একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এখানে বাধ দেয়ার কারণে যে পরিমাণ পলি জমছে এখানে যদি প্রপারলি সমুদ্রের জোয়ারভাটা না আসে তাহলে আপনি যতই বনায়ন করেন তা কার্যকর হবে না।
এর মধ্যে কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা এলাকা প্যারাবনে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে ৪ জুন শুরু হওয়া আগুন ৭ জুন পর্য ন্বিতভ
স্থানীয়দের দাবি, দখলদাররা কেরোসিন ঢেলে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছে, যাতে দ্রুত বন পরিষ্কার করে জমি দখল করা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্যারাবন নিধনকারীরা এখন সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে কাজ চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সেখানে যেতে পারছে না।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, আগেও অভিযান চালানো হয়েছে, নতুন ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সোনাদিয়ার প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে। তবে এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।