কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা সমস্ত স্থাপনা স্বেচ্ছায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। নির্দেশনা অমান্য করলে নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা। ১ জুন আদেশে স্বাক্ষর হলেও ১ জুলাই তা প্রকাশ করে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি।
এরই মধ্যে বুধবার (০১ জুলাই) দিনব্যাপি সমুদ্রসৈকতের লাবনী, সুগন্ধ ও কলাতলীতে মাইকিংও করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগে পড়েছেন কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি জুড়ে সারি সারি ঝুপড়ি দোকান, ত্রিপল আর ভ্যানগাড়ির অস্থায়ী স্থাপনা। কয়েক মাস আগেও যে বালিয়াড়ি ছিল দখলমুক্ত, সেখানে ফিরেছে পুরোনো চিত্র।
পরিবেশবাদীদের দাবির মুখে চলতি বছরের মার্চে কক্সবাজার সফরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসনের অভিযানে উচ্ছেদ করা হয় সহস্রাধিক অবৈধ দোকান ও স্থাপনা। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মাথায় আবারও দখলে চলে গেছে সৈকতের বালিয়াড়ি।
এদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো: মাহমুদুর রহমান সায়েম এ আদেশে এমন নিদের্শনা প্রদান করা হয়েছে। ১ জুন তারিখে নিদের্শনা পত্রটি স্বাক্ষর করা হলেও ১ জুলাই বুধবার সকালে এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রাধিন বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি।
আদেশে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সকল সাময়িক কার্যধারী ব্যবসায়ীদের অবগতির জন্য জানানো হয়, ‘মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের রিট পিটিশন নম্বর—৬২৬/২০১১ এর আদেশ ও কার্ডের শর্ত লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনা করায় পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ২৩.০৯.২০২৫ তারিখের ১৯৪ নং পত্র এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখের ৩৪৪ নং পত্র অনুযায়ী কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনাকারী সকল সাময়িক কার্ড বাতিল করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
তৎপ্রেক্ষিতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কোনো স্থানে নতুন করে আর কোনো সাময়িক কার্ড ইস্যু করা হবে না এবং ইস্যুকৃত সাময়িক কার্ডের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ শেষ হওয়ার পর, ২০২৬—২০২৭ অর্থবছরের জন্য পুনঃনবায়ন করা হবে না মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে; যা বিগত ০১ জুন ২০২৬ তারিখ ২০৭ নং পত্রমূলে সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত করা হয়েছে।
এমতাবস্থায়, সমুদ্র সৈকতের সকল সাময়িক কার্যধারী ব্যবসায়ীকে অতি সত্বর নিজ দায়িত্বে দোকান ও অন্যান্য সকল স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে। অন্যথায়, যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এরই মধ্যে বুধবার দিনব্যাপি সমুদ্রসৈকতের ৩টি পয়েন্টে মাইকিংও করা হয়েছে।
মাইকিংকালে জেলা প্রশাসনের বিচ কমীর্ নাবির হোসেন বলেন, “আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে বুধবার (০১ জুলাই) সকাল থেকে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের কোনো কার্ড ইস্যু করা হবে না। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিজ দায়িত্বে স্থান ত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সে বিষয়ে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ীই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
এদিকে সমুদ্রসৈকতে মাইকিং নিয়ে উদ্বিগ্ন কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
সমুদ্রসৈকতের লাবনী পয়েন্টের চট্টপটির দোকানদার মো. রাসেল বলেন, “এটা আমাদের পৈতৃক ব্যবসা। হঠাৎ করে কার্ড বাতিলের খবর পেয়ে আমরা দিশেহারা। এই ব্যবসাই আমাদের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। পুনর্বাসন ছাড়া যদি দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের পথে বসতে হবে। তাই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই।”
একই পয়েন্টের চায়ের দোকানদার তুহিন বলেন, ‘‘২০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গেই আছি। এটাই আমার একমাত্র জীবিকা, অন্য কোনো কাজও শিখিনি। এই ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে পরিবার নিয়ে পথে বসা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকবে না।”
ফটোগ্রাফার গফুর উদ্দিন বলেন, “কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। দীর্ঘদিন ধরে জেলা প্রশাসনের দেওয়া কার্ড নিয়েই আমরা ব্যবসা করেছি। এখন যদি সেই কার্ড বাতিল হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আর কোনো জীবিকা থাকবে না। আমরা সবাই বেকার হয়ে পড়ব।”
সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বার্মিজ পণ্যের দোকানদার জসিম উদ্দিন বলেন, “আমরা আসলে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ব্যবসা করার জন্য জায়গা দেওয়া হবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা আগের জায়গায় ফিরে এসে জীবিকার তাগিদে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন আবার হঠাৎ করে উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে। যদি আবার উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? কীভাবে পরিবার চালাব? আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।”
একই পয়েন্টের পার্লের দোকানদার মো. কামাল বলেন, “হঠাৎ করে উচ্ছেদের ঘোষণা ও রাজস্ব না নেওয়ায় আমরা চরম অনিশ্চয়তায় আছি। ১৬—১৭ বছর ধরে নিয়মিত রাজস্ব দিয়ে এখানে ব্যবসা করে আসছি। অথচ এখন আমাদের কাছ থেকে রাজস্বও নেওয়া হচ্ছে না। এই ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। উচ্ছেদ হলে এত মানুষের জীবন—জীবিকা কীভাবে চলবে?”
তবে ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের দাবি, উচ্ছেদের আগে ব্যবসায়ীদের যেন পুনর্বাসন করা হয়।
বিচ কিটকট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সোহেল বলেন, “এখানে হাজারো মানুষ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বার্মিজ পন্যের দোকান, কিটকট, বিচ বাইক, জেট স্কি, ওয়াটার বাইকসহ বিভিন্ন ব্যবসা চলছে। হঠাৎ করে এসব বন্ধ হয়ে গেলে এত মানুষ কোথায় যাবে, কীভাবে জীবিকা চালাবে—সেটা নিয়ে সবাই চরম দুশ্চিন্তায় আছে। সৈকত থেকে যদি সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সৈকত কার্যত শূন্য হয়ে যাবে, আর এতে পর্যটন কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, “পরিবেশের ক্ষতির কথা বলা হলেও, যখন দিনে হাজার হাজার পর্যটক সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেন, তখন তো কোনো সমস্যা হয় না। তাহলে দোকান বা কিটকট থাকলেই পরিবেশের ক্ষতি হবে কেন—এটা আমাদের বোধগম্য নয়।”
এব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে কি পরিমাণ কার্ড ইস্যু করা হয়েছে তা বৈঠকের মাধ্যমে জানা যাবে। তবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সৈকতের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করা হবে।
যদিও কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। সৈকতের জোয়ার—ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে সৈকতের এসব ব্যবসা নিয়ে বছরের পর বছর বির্তক আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে গত ৯ মার্চ কক্সবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার—১ (চকরিয়া—পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথবাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এক হাজার দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে।
কিন্তু ঈদের আগে ও পরে সৈকতের পুরো বালিয়াড়ি আবারও দখল হয়ে যায়। রূপ নেয় বস্তিতে। এব্যাপারে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষে ১ জুন সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর জন্য ইস্যুকৃত কার্ডের নতুন করে নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।