মঞ্চে আলো নিভে যায়, হঠাৎ করেই গিটার ঝংকার তোলে আর এক কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে হাজারো তরুণের হৃদয়ে। সেই কণ্ঠ বিদ্রোহের, সেই কণ্ঠ ভালোবাসার, তিনি বাংলা পপসংগীতের প্রবাদপুরুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি গায়কের ৭৬তম জন্মবার্ষিকী।
বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসে আজম খান কেবল একটি নাম নয়, তিনি এক বিপ্লবের সূচনা। দেশীয় গানের ভুবনে পাশ্চাত্য পপের ছন্দ, বৈদ্যুতিক গিটারের মূর্ছনা আর সহজ-সরল কথার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি দেশে তৈরি করেছিলেন এক নতুন ধারা, যা তরুণ সমাজকে দিয়েছিল নতুন পরিচয়।
১৯৫০ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন কিংবদন্তি এ শিল্পী। তিনি একাধারে একজন মুক্তিযোদ্ধা, সংগীতশিল্পী, গীতিকার, অভিনেতা, ক্রিকেটার ও বিজ্ঞাপনের মডেল। বাংলায় পপসংগীতের অগ্রদূত মনে করা হয় তাকে।
ঢাকার আজিমপুর ও কমলাপুরে বেড়ে ওঠা এ কিশোর ছোটবেলাতেই দেখেছেন ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়। মানুষের মুখের ভাষা রক্ষার সংগ্রাম আর ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানের সুর তার মনে গভীর ছাপ ফেলে। বন্ধুদের সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও আব্দুল আলীমের গান শুনতে শুনতেই সংগীত হয়ে ওঠে তার নেশা, তার স্বপ্ন।
ষাটের দশকে ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র মাধ্যমে গণসংগীতে যাত্রা শুরু। তারপর ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেন। ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্পে যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি তার গান সহযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে। রাইফেল হাতে যেমন লড়েছেন, তেমনি কণ্ঠ দিয়েও এ গায়ক উজ্জীবিত করেছেন মুক্তির স্বপ্ন।
স্বাধীনতার পর আজম খান ফেরেন এক নতুন লড়াইয়ে। এ লড়াই সংগীতের লড়াইয়ে। ওই সময়ে বিশ্বব্যাপী The Beatles ও The Rolling Stones-এর প্রভাব থাকলেও দেশে সেই ছোঁয়া তিনি নিয়ে আসেন। গড়ে তোলেন বাংলার নিজস্ব পপধারা। ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বাদ্যযন্ত্রে ভর করে সৃষ্টি করেন সময়ের সাউন্ডট্র্যাক।
সংগীতপ্রেমীদের উপহার দেন ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান, যেগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থায়ী মানুষের হৃদয়ে। অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করা বাংলার এই পপসম্রাট ২০১১ সালের ৫ জুন ক্যানসারের কাছে হার মানেন।