আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা
সাম্প্রতিক প্রবল বর্ষণে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকাসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বন্যা ও পাহাড়ধসে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এ ঘটনায় প্রায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ১৭ জন রোহিঙ্গা। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
রোহিঙ্গা সংকট আজ আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি মানবিক বাস্তবতা। যতদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গারা নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করতে না পারছেন, ততদিন তাদের জীবন, নিরাপত্তা ও মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের যৌথ দায়িত্ব।
কক্সবাজারের অধিকাংশ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। ফলে প্রতি বর্ষায় পাহাড়ধস, ভূমিক্ষয়, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। এসব দুর্যোগে প্রতিবারই প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত অস্থায়ী আশ্রয় পুনর্নির্মাণের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ, টেকসই ও পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে। পলিথিননির্ভর অস্থায়ী আশ্রয় জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য উপযুক্ত নয়। এতে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে, তেমনি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির আশঙ্কাও বহুগুণ বেড়ে যায়।
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ঝুঁকি হ্রাসে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে সংকটের ব্যাপকতার তুলনায় এসব উদ্যোগ এখনও যথেষ্ট নয়। তাই নিরাপদ আবাসন, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার ওপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে মতভেদ বা সমালোচনা থাকতেই পারে। তবে তা হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, গঠনমূলক এবং মানবকল্যাণকেন্দ্রিক। মনে রাখতে হবে, ক্যাম্পে পরিচালিত যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রম সরকারের নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতেই বাস্তবায়িত হয়। তাই পারস্পরিক দোষারোপের পরিবর্তে কীভাবে মানুষের জীবন আরও নিরাপদ করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত আলোচনার মূল বিষয়।
একই সঙ্গে কক্সবাজার জেলার সামগ্রিক পরিবেশগত বাস্তবতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। অপরিকল্পিত আবাসন, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, খাল-নদী ভরাট এবং অপরিকল্পিত যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জানমাল ও জীবিকা ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
দুর্যোগের সময় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তৎপরতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবল দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। দুর্যোগ-সহনশীল আবাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, রোহিঙ্গা হোক বা স্থানীয় বাসিন্দা সবার আগে মানুষ। মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত আমাদের সকল পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।