বর্জ্য সাধারণত ফেলনা হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে কক্সবাজারে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, খাবারের বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে জৈব সার। এতে একদিকে যেমন বর্জ্যের কারণে পরিবেশদূষণ কমানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ফেলে দেওয়া বর্জ্যকে কৃষির উপযোগী সম্পদে পরিণত করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার শহরের কাছাকাছি রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বনতলা এলাকায় গড়ে উঠেছে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কক্সবাজার পৌরসভার বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয়ে এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশেষ গাড়িতে করে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর বর্জ্য কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। এরপর শ্রমিকেরা বর্জ্য বাছাই করে পচনশীল ও অপচনশীল অংশ আলাদা করছেন। মাছ-মাংসের উচ্ছিষ্ট, সবজির খোসা, খাবারের অবশিষ্টাংশসহ পচনশীল বর্জ্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জৈব সারে রূপান্তর করা হচ্ছে। পরে তা শুকিয়ে, চালুনি দিয়ে ছেঁকে বস্তাবন্দী করে বিক্রি করা হয়।
কেন্দ্রের এক নারী শ্রমিক বলেন, হোটেল থেকে আসা বর্জ্য প্রথমে বাছাই করে আলাদা করা হয়। মাছের উচ্ছিষ্ট ও তরকারির বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে সার তৈরি করা হয়। এই কাজের আয় থেকেই তাঁদের সংসার চলে।
আরেক শ্রমিক বলেন, গাড়িতে করে বর্জ্য আনার পর তা নির্দিষ্ট হাউসে রাখা হয়। কয়েক সপ্তাহ প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর শুকিয়ে বড় ও ছোট অংশ আলাদা করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপ শেষে তা সারে পরিণত হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পচনশীল বর্জ্যের সঙ্গে পয়োবর্জ্য নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে জৈব সার তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে পর্যটন এলাকার প্রায় ২০টি হোটেল থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতি কেজি সার প্রায় ১০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এ কাজে ১৮ জনের মতো শ্রমিক যুক্ত আছেন।
জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্রের ঠিকাদার মো. ইয়াছিন বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৮ থেকে ২৪ টন কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে। শীত মৌসুমে এর পরিমাণ আরও বাড়ে। পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত করা গেলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে এ উদ্যোগে বড় বাধা বর্জ্য সংগ্রহের সক্ষমতা। বর্তমানে মাত্র দুটি গাড়ি দিয়ে হোটেল-মোটেল থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে আগ্রহ থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বর্জ্য আনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে সার শুকানো ও বাজারজাত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আয় কমে গিয়ে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে সমস্যা তৈরি হয় বলে জানান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্রের সুপারভাইজার মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, হোটেল-মোটেল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সংগৃহীত মানববর্জ্য এবং বাজার ও হোটেলের জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে সার তৈরি করা হচ্ছে। এই সার পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে কৃষকেরা সুফল পাচ্ছেন। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তিনি বলেন, সব হোটেল-মোটেলের বর্জ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা গেলে প্রতিদিন আরও বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এ জন্য হোটেল-মোটেলগুলোকে বর্জ্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় কেন্দ্রে দেওয়ার বিষয়ে নোটিশ ও মাইকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পয়োবর্জ্য থেকেও সার
হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের বর্জ্যের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও পর্যটন এলাকার সেপটিক ট্যাংকের পয়োবর্জ্য নিয়েও কাজ চলছে। দক্ষিণ মিঠাছড়ির একই সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সেপটিক ট্যাংক থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া বলেন, কেন্দ্রে বর্তমানে কম্পোস্ট, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ও ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট-তিনটি প্ল্যান্ট রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২৪ টন কিচেন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি পর্যন্ত জৈব সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি এক টন ধারণক্ষমতার প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক থেকে বিভিন্ন পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোমেল বড়ুয়া বলেন, বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সেপটিক ট্যাংক পূর্ণ হলে পৌরসভার সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বর্জ্য অপসারণের সেবা নেওয়া যাবে। আবাসিক ভবনের জন্য প্রতি ট্রিপ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে ফি নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা
কক্সবাজার পৌরসভা এলাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর পুরোটা এখনো আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। পৌরসভার কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের পাশাপাশি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ১৭ দশমিক ৫ একর জায়গায় স্যানিটারি ল্যান্ডফিল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ল্যান্ডফিল চালু হলে বর্তমানে ব্যবহৃত কস্তুরাঘাটের ল্যান্ডফিলটি বন্ধ করে জায়গাটি পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রোমেল বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে এসব কার্যক্রম পরীক্ষামূলক ও সীমিত পরিসরে চলছে। ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে কক্সবাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্জ্য নদী, খাল বা সাগরে ফেলার পরিবর্তে উৎস থেকেই আলাদা করে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে পরিবেশদূষণ কমানোর পাশাপাশি তা থেকে সার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব। এতে ‘ফেলনা’ বর্জ্যই হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক সম্পদ।