কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিনই ভিড় করেন হাজারো পর্যটক। তবে আনন্দঘন এই সমুদ্রস্নান অনেক সময় পরিণত হয় দুর্ঘটনায়। ঢেউয়ের টানে প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার তথ্য মতে, গত ১২ বছরে সমুদ্রে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৭ জন, নিখোঁজ রয়েছেন ২ জন। তবে লাইফগার্ডদের তৎপরতায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩ জনকে।
এমন দুর্ঘটনা কমাতে বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৫ জুলাই) দিনব্যাপি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে উদ্ধার মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রদর্শনী, সচেতনতামূলক র্যালি এবং পর্যটকদের নিরাপদ সমুদ্রস্নান বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করে সিআইপিআরবি।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মডার্ন হ্যাচারি পয়েন্ট। নেই কোনো লাইফগার্ড, নেই সতর্কবার্তার লাল পতাকা। এমন অবস্থায় শুক্রবার সন্ধ্যায় সমুদ্রস্নানে নেমে নিখোঁজ হন মেহেরপুর সদর উপজেলার হেলাল উদ্দিন। এখনো মেলেনি তার কোনো খোঁজ।
লঘুচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল। জারি রয়েছে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত। সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙানো হলেও অনেক পর্যটক উপেক্ষা করছেন সতর্কবার্তা ও লাইফগার্ডদের নির্দেশনা।
এমন বাস্তবতায় বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে লাবণী সৈকতে আয়োজন করা হয়েছে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি। উদ্ধার মহড়া, সিপিআর প্রদর্শনী ও লাইফ সেভিং সরঞ্জামের ব্যবহার দেখিয়ে নিরাপদ সমুদ্রস্নানের বার্তা দেন আয়োজকেরা। তবে পর্যটকদের দাবি, শুধু কয়েকটি পয়েন্ট নয়, পুরো ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতই যেন কার্যকর লাইফগার্ড সেবার আওতায় আনা হয়।
পর্যটক আব্দুল গফুর বলেন, “সমুদ্রে অবস্থান করার সময় লাইফগার্ড এবং দিকনির্দেশনাকারীদের দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, প্রত্যেক পর্যটকের উচিত নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং লাইফগার্ডদের নির্দেশনা অনুসরণ করে সমুদ্রে অবস্থান করা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।”
পর্যটক নাছির উদ্দিন বলেন, “লাইফগার্ডরা যেভাবে পর্যটকদের সচেতন করতে কাজ করছেন, এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। তবে কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে। বর্তমানে শুধু লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী-এই তিনটি পয়েন্টে লাইফগার্ড রয়েছে।
প্রশাসন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, টুরিস্ট পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে কাজ করে লাইফগার্ড সংখ্যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের জোয়ার-ভাটা, নিরাপদ সময় ও নিরাপদ স্থানে গোসলের বিষয়ে সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রতিবছর সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।”
সমুদ্রস্নানে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কক্সবাজার সৈকতে কাজ করছেন বেসরকারি সংস্থা সি সেফ লাইফগার্ডের মাত্র ২৭ জন কর্মী। সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও জনবল ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাদের। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে লাইফগার্ডদের মতে, পর্যটকদের সচেতনতা ও সতর্কতা মেনে চলাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী জহিরুল ইসলাম বলেন, “সমুদ্রে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পর্যটকদের অসচেতনতা। অনেকেই সমুদ্রে নামার আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন না। আবার কোথায় গোসল করা নিরাপদ, কোথায় ঝুঁকি রয়েছে বা লাইফগার্ডের তত্ত্বাবধান রয়েছে কি না-এসব বিষয়ও গুরুত্ব দেন না। এই অসতর্কতাই অনেক সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দূর-দূরান্ত থেকে যারা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসেন, তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ-সমুদ্রে নামার আগে অবশ্যই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। কোন এলাকায় গোসল করা নিরাপদ এবং কোন সৈকত লাইফগার্ডের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, তা জেনে নিন।
বর্তমানে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী-এই তিনটি সৈকতে লাইফগার্ড সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছেন। তাই ঝুঁকিপূর্ণ বা লাইফগার্ডবিহীন এলাকায় গোসল করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ, এমন স্থানে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।”
সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সমুদ্রসৈকতে লাল-হলুদ এবং লাল পতাকা ব্যবহার করি। লাল-হলুদ পতাকা নির্দেশ করে যে এলাকাটি লাইফগার্ডের পর্যবেক্ষণাধীন এবং সেখানে গোসল করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
তবে কোনো এলাকায় গভীর গর্ত, স্রোতের ঝুঁকি বা বৈরী আবহাওয়ার সৃষ্টি হলে সেখানে লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়। লাল পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পর্যটকদের ওই এলাকায় পানিতে না নামার জন্য অনুরোধ ও সতর্ক করি, যাতে তারা কোনো ধরনের দুর্ঘটনার শিকার না হন।
আমাদের লাইফগার্ড সদস্যরা প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সমুদ্রসৈকতে দায়িত্ব পালন করেন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থায় থাকেন।”
তবে সমুদ্রস্নানে পর্যটকদের প্রানহানি এড়াতেই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যে বলে জানিয়েছে সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থা।
সিআইপিআরবি’র সি-সেফ প্রকল্পের ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার হাফেজ আহমেদ বলেন, “বিশ্ব পানি ডুবন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আমরা পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের মূল লক্ষ্য মানুষকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা।
কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে বর্তমানে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড দায়িত্ব পালন করছেন। গত ১২ বছরে আমাদের লাইফগার্ডরা পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ১,০৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। একই সঙ্গে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষকে সচেতনতামূলক বার্তা প্রদান করা হয়েছে।
তবে এত দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড দিয়ে লাখো পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এই সৈকতে অন্তত কয়েক’শ প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি উন্নতমানের উদ্ধার সরঞ্জাম এবং উদ্ধারকৃত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি মেডিকেল সাব-সেন্টার স্থাপনও জরুরি।
এ ধরনের কার্যক্রম কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই সমুদ্রসৈকতে নিরাপত্তা ও ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবসের এই বার্তা সবার জন্য-আসুন, সবাই মিলে সচেতন হই এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করি।”
সামান্য সচেতনতা, লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ-এই তিনটিই বাঁচাতে পারে অনেক মূল্যবান প্রাণ মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।