কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে উত্তাল ঢেউ ও স্রোতে ভেসে গিয়ে শান্ত (১২) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে এ ঘটনায় দুটি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৬ জন বিপদে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় ১৫ জনকে উদ্ধার করা হয়।
নিহত শান্ত ঢাকার খিলগাঁওয়ের গোরান এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেনের ছেলে। সে ধানমন্ডির ফয়জুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল।
উদ্ধার পর্যটকরা হলেন-আফলাম (১৮), ইয়ামিন (১৬), কাওসার (১৭), সাইফুল ইসলাম (১৫), হারিস (১৩), আব্দুল্লাহ (৩৫), রিয়াদুল (১৮), তাহসিম (১২), হাসনাইন (১২), আদিল হাসান (১৫), মুসা (১৮), শিব্বির (৩০), আব্দুল্লাহ (২২), জিহাদ (১৭) ও নাইম। তারা সবাই ঢাকার তেজগাঁওয়ের দারুল আরকাম ও ধানমন্ডির ফয়জুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতে এ ঘটনা ঘটে। দুপুর একটার দিকে সৈকতের এক পাশে শিশুটির মরদেহ ভেসে আসে। পরে মরদেহ উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর ইনানী সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যটকদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ সৈকতে বেড়াতে এলেও সেখানে দৃশ্যমান লাইফগার্ড ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, ঢাকার তেজগাঁওয়ের দারুল আরকাম ও ধানমন্ডির ফয়জুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৬ জন বৃহস্পতিবার সকালে ইনানী সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁরা সাগরে গোসল করতে নামেন। একপর্যায়ে উত্তাল ঢেউ ও প্রবল স্রোতে তাঁরা বিপদে পড়েন। এ সময় কয়েকজন স্রোতে ভেসে যেতে থাকলে চিৎকার শুরু করেন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিচকর্মী ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। দুটি ট্রলারের সহায়তায় ১৫ জনকে উদ্ধার করা হয়। তবে নিখোঁজ থাকে শিশু শান্ত। পরে দুপুর একটার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, একজন সাঁতার কাটতে কাটতে সাগরের মাঝামাঝি চলে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে স্রোতে ভেসে যেতে দেখা যায়। তখন একটি নৌকা নিয়ে তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন তাঁরা। ওই সময় আরেকজনকেও উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। চোখের সামনেই তিনি স্রোতে ভেসে যান।
আরেক উদ্ধারকারী স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, গোসল করতে করতে তাঁরা সাগরের অনেকটা গভীরে চলে যান। উত্তাল ঢেউ দেখে অনেকে তাঁদের গোসল করতে নিষেধ করেছিলেন। তারপরও তাঁরা স্রোতের টানে গভীর পানিতে চলে যান।
ফয়জুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ছেলেটি প্রথমে তীরের কাছাকাছি ছিল। পরে তাকে বেশি দূরে যেতে নিষেধ করা হয়। এরপর তাঁরা সবাই মিলে এগিয়ে যান। কিন্তু এর মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ইনানী ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক গাজী আতাউর রহমান বলেন, দুটি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৬ জন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাগরে গোসল করতে নামেন। কয়েকজন পানির স্রোতে ভেসে যেতে থাকলে তাঁরা চিৎকার শুরু করেন। তখন দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। দুটি ট্রলারের সহায়তায় প্রায় সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এ ঘটনায় ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ইনানী সৈকতে লাইফগার্ড না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে গাজী আতাউর রহমান বলেন, 'এখানে কোনো লাইফগার্ড নেই। কেন নেই, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।'
সৈকতে বেড়াতে এসে এমন দুর্ঘটনা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যটকেরা। গাজীপুরের বাসিন্দা আমিনুল হক বলেন, ইনানী সমুদ্রসৈকতে কোনো লাইফগার্ড দেখা যায় না। কক্সবাজারের অন্যান্য এলাকায় লাইফগার্ড থাকলেও এখানে তা চোখে পড়ে না।
পর্যটক হাসানুল হক বলেন, একটি ছেলেকে সাগরে গোসল করতে নেমে জোয়ারের স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছেন তিনি। এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় লাইফগার্ড, লাইফ জ্যাকেট এবং কোস্টগার্ডের স্পিডবোটসহ প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম থাকা জরুরি। এসব ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে প্রাণ রক্ষার সুযোগ বাড়ত।
এর আগে গত ১৪ অক্টোবর কক্সবাজারের হিমছড়ির পেঁচার দ্বীপ সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়।
পরপর এমন দুর্ঘটনায় কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পর্যটকদের প্রশ্ন, প্রাণহানির ঘটনা বারবার ঘটলেও ইনানী সমুদ্রসৈকতে নিরাপত্তা জোরদার, লাইফগার্ড নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন?