কক্সবাজারে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা মাদকের গডফাদারদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবনকারীদের পাশাপাশি মাদকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে।
বুধবার বিকেলে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ সুভাষ হলে জেলা পুলিশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিআইজি বলেন, “আপনারা দেখেছেন, এখানে বিশাল বড় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের গডফাদাররা এমপি হয়েছেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন। যে ব্যক্তি মাদক ব্যবসা করে এমপি কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যান হন, তিনি তো মাদকের বিস্তারই ঘটাবেন। এগুলোই ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।”
তিনি বলেন, “তারা আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করবে। আজ সেই জায়গা থেকে আপনারা একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন। পুরোনো সমস্ত ব্যবস্থা ভেঙে আমরা এই কক্সবাজারকে আবার শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নতির শহরে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ।”
# উন্নয়ন ধরে রাখতে প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ
কক্সবাজারে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সৃষ্টি হবে। এর ফলে কক্সবাজার দ্রুত একটি উন্নত শহরে পরিণত হবে।
তবে উন্নয়নের এই ধারা ধরে রাখতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ডিআইজি বলেন, “এই উন্নতিকে বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।”
# সড়ক, নৌ ও সমুদ্রপথে মাদক পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা
কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের কথা তুলে ধরেন ডিআইজি। তিনি বলেন, কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে সড়ক, নৌ ও সমুদ্রপথে মাদক চোরাচালানের বিভিন্ন রুট রয়েছে।
মাদক চোরাচালান বন্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “এখানে শুধু যারা মাদক ক্রয়-বিক্রয় করে বা মাদক সেবন করে, কেবল তারা নয়; মাদকের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি যত প্রভাবশালীই হন না কেন, আইনের আওতায় তাকে আসতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মাদকের সঙ্গে কোনো আপস হবে না।”
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও কঠোর বার্তা দেন ডিআইজি। তিনি বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য মাদকের সঙ্গে আপস করলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
# মিথ্যা অভিযোগকারীদেরও সতর্ক করলেন ডিআইজি
মাদকবিরোধী অভিযানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ বা অপপ্রচারের বিষয়েও সতর্ক করেন আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী।
তিনি বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
“আমরা মাদকের সঙ্গে জড়িত কিংবা মাদকের সহযোগী কাউকে ছাড় দেব না। এ ব্যাপারে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন,” বলেন তিনি।
# ‘মাদকমুক্ত কক্সবাজার করে যেতে চাই’
কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডিআইজি বলেন, সমাজের মানুষ জানেন তাদের আশপাশে কারা মাদক সেবন করে এবং কারা মাদক বিক্রি করে। তাই মাদক নির্মূলে জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “এটি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা। এই জায়গা থেকে যদি আমরা মাদকমুক্ত করতে না পারি এবং অন্য জায়গা থেকে যদি এ নিয়ে কথা বলা হয়, সেই লজ্জা তো আমার। আমি সেই লজ্জা নিয়ে এখান থেকে যেতে চাই না। আমি এখান থেকে মাদকমুক্ত করে যেতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
সুধী সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান,
# ‘মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে’
সুধী সমাবেশে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
“আপনারা সবাই এই সমাজকে নিরাপদ রাখার জন্য, আপনাদের সন্তানদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। এটি অত্যন্ত আশার কথা। আমরা জানি, মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। আমরা জয়ী হব,” বলেন তিনি।
# সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিসহ সব অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
কক্সবাজারকে শুধু মাদকমুক্ত নয়, শান্তির শহরে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “এটা আপনাদের কাছে কথার কথা বলছি না, আমি অঙ্গীকার করে যাচ্ছি। আমি জানি কাজটা কীভাবে করতে হয়।”
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “যারা মনে করছেন, এখানে সন্ত্রাস করে, চাঁদাবাজি করে কিংবা মাদকের গডফাদার হয়ে মাদক ব্যবসা করে আপনারা আখের গুছিয়ে নেবেন—আপনারা ভুলে যান। আপনাদের সময় ও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যে কয়দিন আপনাদের ধরতে পারছি না, সেই কয়দিনকে অবকাশকালীন সময় হিসেবে ধরে নিন। তবে আপনাদের ছাড়া হবে না।”
# মাদকবিরোধী র্যালি
সুধী সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, কক্সবাজার পৌরসভার কমিউনিটি পুলিশিং এর কার্যকরী কমিটির সভাপতি রফিকুল হুদা চৌধুরী, সদর উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিং এর কার্যকরী কমিটির সভাপতি আবদুল মাবুদ, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পালিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুস, প্রেসক্লাব সভাপতি মাহবুবুর রহমান, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান, জিডি অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, কমিউনিটি পুলিশিং কক্সবাজার পৌরসভার কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামী কক্সবাজার শহর শাকার সেক্রেটারী রিয়াজ মোহাম্মদ শাকিল, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবদুল শুক্কুর, কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হাশেম, কমিউনিটি পুলিশিং কক্সবাজার পৌরসভার উপদেষ্টা এস্তাফিজুর রহমান, প্রফেসর ড. মোস্তফা কামিল, জন্মাষ্টমী উৎযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দোলন ধর, জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ইমাম হাফেজ মাওলানা মুফতী সোলাইমান কাসেমী, কমিউনিটি পুলিশিং কক্সবাজার পৌরসভা কমিটির উপদেষ্টা নাছিমা আক্তার বকুল প্রমুখ।
সমাবেশ শেষে কক্সবাজার জেলা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে বেলুন উড়িয়ে মাদকবিরোধী র্যালির উদ্বোধন করা হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।