রোহিঙ্গা সংকট এখন নবম বছর শেষ করে ১০ম বছরে পদার্পণ করেছে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গা মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের বেশির ভাগ তহবিল যাচ্ছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক এনজিওদের কাছে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সংগঠনগুলো। আজ কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ও কোস্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা তহবিল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, এতে স্থানীয় সংগঠনগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। “রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের তহবিল কোথায় যাচ্ছে?” শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় অংশীজনদের অধিকতর অন্তর্ভুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সিসিএনএফ-এর সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় এনজিও অগ্রযাত্রার নির্বাহী পরিচালক হেলাল উদ্দিন, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী, রোকেয়া ফাউন্ডেশনের আঞ্জুমান আরা, কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. শাহিনুর ইসলাম, রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল কবির,হেলাল উদ্দিন,কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী, কক্সবাজার সিভিল রাইটস ফোরামের সভাপতি মো: নাছির উদ্দিন, কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর সভাপতি মো:নুরুল ইসলাম,উখিয়া অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল আলম, উখিয়ার ইমাম সমিতির সাধারন সম্পাদক জাফর আলম, মোস্তাফিজুর রহমান কাজল এছাড়াও সিসিএনএফ-এর সদস্যবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মোঃ শাহিনুর ইসলাম গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তার উপস্থাপনায় তিনি বলেন, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (JRP) অনুযায়ী ১৫.৬ লাখ মানুষকে সহায়তা প্রদানের জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এই তহবিলের ৮৭.৯৬% জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে, ৭.৭৮% আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছে এবং ৪.২৬% জাতীয় এনজিওগুলোর কাছে রয়েছে। অন্যদিকে, JRP-তে অ্যাপিলিং পার্টনার হিসেবে স্থানীয় এনজিওগুলোর কোনো তহবিল নেই। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের ৬৩.৬% আন্তর্জাতিক এনজিও, ৩৩.৯% জাতীয় এনজিও এবং মাত্র ২.৫% স্থানীয় এনজিওগুলো পায়। তিনি আরও তুলে ধরেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিলের ৯২% জাতিসংঘের সংস্থা এবং ৮% আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো পেয়েছে। অর্থাৎ প্রায় সব তহবিলই জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যাদের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
নুরুল কবির বলেন, ক্যাম্প এলাকার ভেতরে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষ কোনো ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন না, অথচ আশপাশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন। রবিউল আলম পরিবেশ সুরক্ষা, ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি টেকসই সমাধান ছাড়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা সম্ভব নয়। জাফর আলম বলেন, এই সংকট সমাধানে আসিয়ান, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রোহিঙ্গা সংকট কক্সবাজারের শিক্ষা খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তিনি স্থানীয় জনগণের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মানবিক তহবিলের অন্তত ২৫% সরাসরি স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে প্রদানের আহ্বান জানান। হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (JRP) এবং পুলড ফান্ড ব্যবস্থায় স্থানীয় সংস্থাগুলোর কোনো প্রবেশাধিকার নেই অথবা থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত। তিনি স্থানীয় সংস্থাগুলোকে JRP-তে অ্যাপিলিং পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান, যাতে তারা সরাসরি এসব তহবিলে প্রবেশাধিকার পায়। প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নির্গত বর্জ্য স্থানীয় কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। নুরুল ইসলাম হেলালী জোর দিয়ে বলেন, স্থানীয় এনজিওগুলোকে তহবিল প্রদান কোনো দয়া নয়; বরং এটি স্থানীয় সংস্থাগুলোর অধিকার। মমতাজ উদ্দিন বাহারী রোহিঙ্গা সংকটের একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।