কক্সবাজারে গত আট মাসে ৯৭ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর বিপরীতে গত বছরের প্রথম আটমাসে ৯৯টি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। গতকাল জেলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবহিতকরন সভায় এমন তথ্য জানিয়েছেন জেলা পুলিশ।
সভায় পুলিশ সুপার এম এন সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩ হাজার ৩৯৯টি মামলা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১১৭টি। এক বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৮২টি। এ সময়ে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা ও অপহরণের মামলা কমলেও বেড়েছে চুরি, মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানের মামলা।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে কক্সবাজারে খুনের মামলা হয়েছে ৯৭টি, ডাকাতি ১৪টি, দস্যুতা ২৩টি, চুরি ১৬০টি, অপহরণ (দণ্ডবিধি) ৪৭টি, মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত ১ হাজার ৪৯টি এবং চোরাচালানের মামলা হয়েছে ১০২টি।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের একই সময়ে খুনের মামলা ছিল ৯৯টি, ডাকাতি ১৬টি, দস্যুতা ২৫টি, চুরি ১৫৭টি, অপহরণ ৫৫টি, মাদকদ্রব্য ১ হাজার ৫টি এবং চোরাচালানের মামলা ছিল ৪৯টি।
হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খুন, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা প্রতিটিতে ২টি করে কমেছে। অপহরণের মামলা কমেছে ৮টি। বিপরীতে চুরি বেড়েছে ৩টি, মাদকদ্রব্যের মামলা ৪৪টি এবং চোরাচালানের মামলা বেড়েছে ৫৩টি।
পুলিশ সুপার এম এন সাজেদুর রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবছর খুনের ঘটনা কমেছে। এছাড়াও মাদকদ্রব্য মামলা ও চোরাচালান মামলা বেড়েছে। মামলা বাড়লেই আইনশৃঙ্খলা খারাপ হচ্ছে তা নয় বরংচ মামলা মানেই অপরাধ সংঘটিত করতে বাঁধা দেয়া বলে জানান তিনি।
পুলিশ সুপার চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় রুজু হওয়া ৯৭টি খুনের মামলার কারণভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব খুনের মামলায় পূর্বশত্রুতার কারণে ২৩টি, ২০টি হত্যার কারন জানা যায়নি এখনো, পারিবারিক কলহে ১৭টি, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধে ১২টি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৪টি মামলা হয়েছে। আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ৪টি এবং পরকীয়াকে কেন্দ্র করে ৩টি খুনের মামলা হয়েছে।
এ ছাড়া অপহরণপূর্বক হত্যার মামলা ৪টি, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ১টি, ছিনতাইকারীর আঘাতে ১টি, চুরির আঘাতে ১টি, ধর্ষণে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ১টি, মানব পাচারকে কেন্দ্র করে ১টি, ধর্ষণ করে হত্যার ১টি, নবজাতক হত্যার ১টি, বন্দুকযুদ্ধে ১টি, ইউডি থেকে খুনের ১টি এবং কোর্ট পিটিশনের মাধ্যমে ১টি মামলা হয়েছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে খুনের কোনো মামলা হয়নি।
পুলিশ সুপার বলেন, বেশিরভাগ খুনের ঘটনা পূর্ব শত্রুতা কিংবা পারিবারিক কলহ ও জমি বিরোধ। এছাড়া গত বছরের তুলনায় এ ঘটনা অনেকটা কমেছে। আমরা কোন ঘটনাকেই ছোট করে দেখছি না। সব ঘটনাকেই গুরুত্ব সহকারে নিয়ে কাজ করছে জেলা পুলিশ।
জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী কার্যক্রমের পরিসংখ্যানেও চলতি বছরের সঙ্গে আগের বছরের বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত ৩৭৮টি মামলা করেছে জেলা পুলিশ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৫২৩ জন। এ সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৭ লাখ ৩ হাজার ২৪১ পিস ইয়াবা, ৩ হাজার ৬৭ লিটার দেশি মদ, ৬২ কেজি ৩৫০ গ্রাম গাঁজা, ৫৪ বোতল বিয়ার এবং ১ কেজি ২৫০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ।
২০২৫ সালের একই সময়ে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ১১৫টি এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল ১৫১ জন। তখন উদ্ধার করা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৩০৬ পিস ইয়াবা, ২ হাজার ৩০৬ লিটার দেশি মদ, ১৫ কেজি ১২০ গ্রাম গাঁজা ও ৮ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ। যা জেলা পুলিশী কার্যক্রমের অগ্রগতিই প্রমাণ করে বলে জানান পুলিশ সুপার।
মাদকের পাশাপাশি চলতি বছরের আট মাসে অস্ত্র আইনে জেলা পুলিশের ৬২টি মামলায় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৪টি রাইফেল, ১২টি বিদেশি পিস্তল, ৩৪টি দেশীয় বন্দুক, ১৮টি এলজি, ১৪টি ওয়ানশুটারগান ও ১টি শর্টগান। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ৮৩টি। এ ছাড়া উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ২২৫ রাউন্ড গুলি।
২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে অস্ত্র-সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৪২টি এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল ৫২ জন। তখন উদ্ধার করা হয়েছিল ১টি রাইফেল, ২টি দেশি পিস্তল, ২টি বিদেশি পিস্তল, ১৭টি একনলা বন্দুক, ২১টি এলজি ও ২টি ওয়ানশুটারগান। মোট আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল ৪৫টি।
এদিকে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গত কয়েক দিনে ছিনতাইকারী, মাদকসেবী ও চোরসহ মোট ৩১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিনতাইকারী ১৬৩ জন, মাদকসেবী ১০৪ জন এবং চোর ৪৮ জন।
শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে কক্সবাজার জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের রহস্য উদঘাটন সংক্রান্তে অবহিতকরণ সভায় এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি ডাকাতি মামলার আসামি শাহজাহান আলম ওরফে ‘বাদইল্যা ডাকাতকে’ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল এলাকায়। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজার জেলা ও জেলার বাইরে সংঘটিত এসব ডাকাতির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, সাহারবিলের নইব্যাচোরার ভাই হিসেবে পরিচিত বাদইল্যা ডাকাতকে জেলার বড় বড় ডাকাতির ঘটনাগুলোর অন্যতম মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডাকাতির সময় চক্রটি একটি নোহা গাড়ি ব্যবহার করত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে গাড়িটির রং বিভিন্ন সময় পরিবর্তন করা হতো। কখনো কচুপাতা রং, কখনো সাদা আবার কখনো ছাই রঙে গাড়িটি ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণত রাত ১টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে এসব ডাকাতি সংঘটিত হতো। মাত্র ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে ডাকাতি শেষ করে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সটকে পড়ত চক্রটি। তারা মূলত নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করত।
পুলিশ সুপার বলেন, ডাকাতির আগে চক্রটি সংশ্লিষ্ট বাড়ি বা স্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করত। আগে থেকে তথ্য নিয়ে সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা ডাকাতিতে নামত।
অভিযানে বাদইল্যা ডাকাতকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি একটি নোহা গাড়ি ও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ডাকাতিতে ধরা পড়লে আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য ডাকাতির টাকার নির্দিষ্ট অংশ তারা আলাদা করে রাখেন যাতে কোন সদস্য ধরা পড়লে তড়িৎ আইনি সহায়তা মিলে। ডাকাতদের আইনী সহায়তা দেয় এমন কয়েকজন আইনজীবীর নামও তারা পেয়েছেন বলে জানান।
পুলিশ সুপারের এমন বক্তব্যের অবশ্য প্রতিবাদ জানিয়েছেন কক্সবাজার আইনজীবির সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, পুলিশ সুপার এহেন বক্তব্য আইনজীবিদের জন্য অসম্মান জনক। আইনজীবিদের কাজই জামিন চাওয়া। সেটা দেওয়া না দেওয়া বিচারকের বিবেচ্য বিষয়।