শিপন পাল
নতুন অর্থবছরের শুরুতে জমি নিবন্ধনে উৎসে কর বৃদ্ধির বিভ্রান্তিতে প্রায় এক সপ্তাহ স্থবির থাকার পর কক্সবাজারে আবারও সচল হয়েছে জমি নিবন্ধন কার্যক্রম। উৎস করের হার পূর্বের অবস্থায় বহাল রাখার সরকারি সিদ্ধান্তে জমির ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে ফিরে এসেছে স্বস্তি। তবে দানপত্রের ওপর নতুন করে দানকর আরোপের বিষয়টি নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ঘোষিত জমির শ্রেণি অনুযায়ী উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়। অতীতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে নাল জমির ক্ষেত্রে প্রতি শতকে ২৫ হাজার টাকা, আবাসিক জমির জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং বাণিজ্যিক জমির জন্য ১ লাখ টাকা উৎস কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে ভূমি নিবন্ধনের হার কমে যায় এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়েন। পরবর্তীতে দাবির মুখে সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়।
চলতি অর্থবছরের শুরুতেও উৎসে কর বৃদ্ধি পেতে পারে—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে জেলার বিভিন্ন স্থানে জমি ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। অতিরিক্ত করের আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখেন। ফলে ১ জুলাই থেকে কয়েকদিন বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কবলা দলিল নিবন্ধনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, আগের উচ্চহারের উৎস করই বহাল থাকবে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উৎস কর পূর্বের হারেই বহাল রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, উৎসে করের হার অপরিবর্তিত থাকায় সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমেছে। ফলে নিবন্ধন কার্যক্রমে আবারও গতি ফিরে এসেছে এবং ক্রেতাদের আগ্রহও বাড়ছে।
এদিকে নিবন্ধন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎসে করের হার অপরিবর্তিত থাকলেও ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় কিছু নতুন পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ই-চালানের মাধ্যমে উৎস কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা, হেবা ঘোষণা ও দানের ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ এবং দানপত্রের ওপর দানকর প্রযোজ্য করা। এছাড়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা সাধারণ আম-মোক্তারনামা দলিলের ক্ষেত্রেও কিছু বিধান সংশোধন করা হয়েছে।
ভূমি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, কর কাঠামো বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ থাকলে মানুষ বৈধভাবে জমি নিবন্ধনে আরও উৎসাহিত হবে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম বলেন, 'উৎসে কর বাড়ার খবর শুনে আমি জমি রেজিস্ট্রেশনের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছিলাম। অতিরিক্ত কর দিতে হলে অনেকের পক্ষেই জমি কেনা কঠিন হয়ে যেত। এখন আগের হার বহাল থাকায় স্বস্তি পেয়েছি।'
রামু উপজেলার বাসিন্দা শ্যামল দাশ বলেন, 'জমি নিবন্ধনের খরচ এমনিতেই অনেক। এর সঙ্গে উৎসে কর বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতো। সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করায় আমরা উপকৃত হয়েছি।'
চকরিয়া উপজেলার গৃহিণী রিনা আক্তার বলেন, 'পরিবারের জন্য একটি ছোট জায়গা কেনার পরিকল্পনা ছিল। কর বৃদ্ধির গুঞ্জনের কারণে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় নিবন্ধনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছি।'
তবে দানপত্রের ওপর দানকর আরোপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। উখিয়ার বাসিন্দা বিমল কান্তি পাল বলেন, 'পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর আরোপ হলে অনেকেই সমস্যায় পড়বেন। বিষয়টি সরকারকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত।'
জেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আবুল হোছাইন বলেন, 'চলতি অর্থবছরের শুরুতে উৎসে কর বৃদ্ধির গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উৎস কর বৃদ্ধি না করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত উৎস করের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেয়েছেন। এখন ভূমি ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।'