সাইফুল আফ্রিদি
কেউ আসেন ট্রেজারি শাখায়, কেউ নকলখানায়; কেউ এজলাসে হাজিরা দিতে, আবার কেউ মামলার নথিপত্রের খোঁজে। প্রতিদিন নানা কাজে কক্সবাজার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে ভিড় করেন দুই থেকে তিন হাজার মানুষ। তাদের কেউ বিচারপ্রার্থী, কেউ আইনজীবী, কেউ মামলার আসামি বা সাক্ষী এমনকি জেলার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও।
কিন্তু ন্যায়বিচারের আশায় প্রতিদিন যে ভবনে মানুষের আসা-যাওয়া, সেই ভবনটিই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ছাদ থেকে খসে পড়ছে কংক্রিট ও পলেস্তারা, কলাম-পিলারে দেখা দিয়েছে ফাটল। আর এই ভবনেই বিচারক, আইনজীবী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চালাতে হয় নিয়মিত কাজ।
মঙ্গলবার সরেজমিনে কক্সবাজার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে গিয়ে দেখা যায়, একটি-দুটি নয়, প্রায় সব কটি কলাম পিলারেই ফাটল। ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে জং ধরা লোহার রড। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা উঠে গেছে, কোথাও ছাদ থেকে কংক্রিট খসে পড়ার চিহ্ন। প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাথার উপরেই কয়েক চিলতে পলেস্তারা খসে পড়ার বড় বড় ক্ষত।
এই ভবনেই চলছে বিচারিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আইন শৃংখলা বিঘ্নকারী (দ্রুত বিচার) আদালত, প্রশাসনিক শাখা, রেকর্ড রুম, সেরেস্তা, ট্রেজারি ও এজলাস ও নকল সরবরাহকারী শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম। ভবনের দুই পাশে রয়েছে দুটি ক্যান্টিনও।
এই ভবনে শুধু এসব কাজই নয়, নিয়মিত আসা-যাওয়া রয়েছে বিচারকদেরও। সরকারি তালিকা অনুযায়ী, সদরভিত্তিক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, দুইজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চারজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত রয়েছে। এসব আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রতিদিনই বিচারকদের এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অবস্থান করতে হয়।
প্রতিদিন এই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে আইনজীবী, তাঁদের সহকারী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আদালতে আসা হাজারো মানুষকে।
বিষয়টি শুধু সরেজমিনে দেখা চিত্র নয়; সরকারি নথিতেও ভবনটির ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে কয়েকবার। গত ১ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত বিভাগের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘আলোচ্য ভবন ব্যবহারকারীগণ জীবন-ঝুঁকিতে রয়েছেন।’
গণপূর্ত বিভাগের ওই চিঠি অনুযায়ী, ১৯৫২ সালে নির্মিত ভবনটি দীর্ঘদিন কক্সবাজার জেলা আদালত ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। জেলা জজ আদালতের নতুন ভবন নির্মাণের পর ২০০৯ সাল থেকে এটি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
সাত দশকের বেশি পুরোনো ভবনটিতে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার সংস্কার করা হলেও সেগুলো টেকসই হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকবার সংস্কার করেও টেকসই করা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন সময় ছাদ থেকে কংক্রিট খসে পড়লেও এখন পর্যন্ত সৌভাগ্যক্রমে তা কারও গায়ে পড়েনি বলেও উল্লেখ রয়েছে সরকারি ওই নথিতে।
পুরোনো ভবনের এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূমিকম্পের আশঙ্কাও। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) ২০২০ অনুযায়ী কক্সবাজার সিসমিক জোন-৩-এর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণে ভবনটিতে যেকোনো সময় ভূমিকম্পজনিত দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ভবনটির অনেক কিছুই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালে জেলা জজ বরাবর একটি প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে সেটি কতদূর এগিয়েছে বা কী অবস্থায় আছে, তা আমার জানা নেই। তবে চলতি অর্থবছরে দুটি কক্ষ নির্মাণের জন্য আমরা বরাদ্দ পেয়েছি।’
তবে ঝুঁকি এড়াতে পুরোনো ভবন সংস্কারের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের ৪ জুন জরাজীর্ণ এই ভবনের পরিবর্তে ৬ হাজার বর্গফুটের একটি অস্থায়ী টিনসেড সেমিপাকা ভবন নির্মাণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ চেয়ে একটি প্রাক্কলন পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।
বিকল্প ভবনের উদ্যোগটি বর্তমানে কোথায় আছে জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই।
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই প্রতিদিন বিচারকাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আইনজীবীরাও ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করছেন।
কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, 'ঝুঁকি জেনেও আইনজীবীদের কাজ করতে হয়। অবশ্যই তাঁদের জীবনেরও ঝুঁকি আছে। আমরা আশা করছি, ঝুঁকি কাটাতে এখানে জুডিশিয়াল কমপ্লেক্স ভবন করা হবে।’
আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী শহিদুল বলেন, 'দেখে মনে হচ্ছে অনেক পুরনো ভবন, বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত দেখা যাচ্ছে। পিলারেও ভাঙন ধরেছে। নতুন ভবন করলে ভালো হয়।'
বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রস্তাবটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, 'ওখানে জেলা প্রশাসনের কাজ নাই, ওটা জুডিশিয়ারি বিভাগ। তবে বিষয়টি জানলাম। খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।'