ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেছে জামায়াত জোটের সাংসদরা।
বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বক্তব্যের জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হলে জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের কার্ড প্রদর্শন করেন।
সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতিতে সংসদ নেতা ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের একটি অংশ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন।
এ সময় বিউগলে জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংসদের কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সদস্যদের দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসে ছিলেন। তবে এসময় জামায়াত জোটের সদস্যদের প্রতিবাদ বন্ধ রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদে তার ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী একটি বাধ্যবাধকতা।
স্পিকার বলেন, “আমরা সংবিধানের বিধান ও জাতীয় সংসদের রেওয়াজ অনুসরণ করতে চাই। দয়া করে আপনারা খারাপ কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন না।”
তবে স্পিকারের আহ্বানের মধ্যেই বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
রীতি মেনে প্রথম দিনই জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণের সূচি প্রকাশের পর থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল জামায়াত জোট।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মূলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার।
জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধীদলীয় সদস্যরা ওয়াক আউটের পর এদিনের সংসদ অধিবেশনে আর যোগ দেননি।
বিরোধী দলের এমন আচরণকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছে সরকারি দল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের সামনে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
তবে তিনি মনে করেন, জামায়াতের এমপিরা প্ল্যাকার্ড না দেখালেও পারতেন।
রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করলে প্রতিবাদ জানিয়ে হৈ চৈ করে ওয়াক আউট করে বেরিয়ে যান বিরোধীদলীয় সদস্যরা। অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “রাষ্ট্রপতির তিন অপরাধে তার ভাষণ বর্জন করা হয়েছে। তার বক্তব্য এই মহান সংসদে আমরা শুনতে পারি না। এই সংসদ জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, এই সংসদে ফ্যাসিস্টের দোসর, খুনির কোনও দোসর যেন বক্তব্য রাখতে না পারে।”
কারণ তিনটি তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই প্রেসিডেন্ট তিনটা কারণে অপরাধী। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ২০২৪ সালের অগাস্টের ৫ তারিখ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন।”
তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমির বলেন, “রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অধ্যাদেশ স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন তারা সংস্কার সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন। এই শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি।”
এসময় বিরোধী দলীয় হুইপ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “প্রথম অধিবেশনে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই অংশ নিয়েছে। শুরু থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অংশ নিয়েছি। আমরা স্পিকারের কাছে বলেছিলাম, ফ্যাসিবাদের দোসর কেউ এই সংসদে বক্তব্য দিতে পারবে কিনা।
“যখন ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদে আসেন, তখন আমরা সংসদে বক্তব্য দিতে চেয়েছিলাম। বিরোধীদলীয় নেতা বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন এই বিষয়ে। কিন্তু বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। তাই অধিবেশন ওয়াকআউট করেছি।”
পরে বিরোধী দলের ওয়াকআউট নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিরোধী দলের ওয়াক আউটের অধিকার আছে, বিধি মোতাবেক তারা করতে পারেন, করেছেন। নজিরবিহীন কোনো ঘটনা নয়। তারা করতে পারেন। তারা রাষ্ট্রপতি আসার আগেও তো কয়েক ঘণ্টা সেশন হয়েছে।
“আজকের দিনের জন্য সারা জাতি ১৮ বছর অপেক্ষা করেছে। গণতন্ত্র রচিত হয়েছে। নতুনভাবে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছি।”