স্বাধীনতার পর থেকে কক্সবাজারের উপকূলীয় জনপদ মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়নধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পেরেও এক মৌলিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় বারবার থমকে গেছে। বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী, যা আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে, তা এখনও মূল ভূখণ্ড কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সম্পূর্ণ নৌপথনির্ভর। প্রতিদিন জোয়ার-ভাটা, বৈরী আবহাওয়া আর নৌযানের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে সর্বস্তরের মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সাগর চ্যানেল পাড়ি দিতে হয়। এই দুর্ভোগের বিপরীতে বহুদিনের জীবন্ত স্বপ্ন- মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু এখন নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক কক্সবাজার সফরকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের প্রধান উন্নয়ন এজেন্ডা হিসেবে বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ মহলের নীতি-নির্ধারণী টেবিলে তোলার দাবি উঠেছে।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এই দ্বীপের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে নৌপথ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হলে স্থানীয় পর্যায়ে মহেশখালীকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থায়ী সড়ক যোগাযোগেযুক্ত করার দাবি ওঠে। কিন্তু দশকের পর দশক কেটে গেলেও এই জনদাবিটি কখনোই বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে আজও মানুষকে ৬ নম্বর ঘাট ও নুনিয়ারছড়া ঘাটের কাঠের ট্রলার, স্পিডবোট বা লাইফবোটের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সামান্য বৈরী আবহাওয়াতেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্ভোগমুখর হয়ে ওঠে। অথচ একই সময়ে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি হাব এবং প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল মিলিয়ে মহেশখালীর ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্ব বদলে গেছে আমূল।
সমকালীন বাস্তবতায় যেখানে এই অঞ্চলের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, সেখানে মহেশখালীর লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সামগ্রিক অর্থনীতি এখনো নৌযানের সময়সূচি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস আর উত্তাল সমুদ্রের মর্জির ওপর নির্ভর করে। কাঁচামাল পরিবহন, মৎস্যসম্পদ, লবণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা- সবই এই যাতায়াত সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আটকে আছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা হয় বিগত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই ছিল এই স্বপ্নের সেতু বাস্তবায়ন করা। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক শেষ জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেতু নির্মাণ করা হবে। নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদ তাঁর দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এবং দ্বীপবাসীর স্বপ্ন পূরণে রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী মহলে নানামুখী জোরালো তৎপরতা শুরু করেন। তাঁর এই কার্যকর তৎপরতার ফলেই অবহেলিত সেতু প্রকল্পটি আমলাতান্ত্রিক ফাইলবন্দি দশা থেকে মুক্ত হয়ে আজ সরকারের সর্বোচ্চ উন্নয়ন এজেন্ডার টেবিলে এসে পৌঁছেছে।
এই বিষয়ে সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, "মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু কেবল একটি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ নয়, এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের লাইফলাইন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং দৃশ্যমান অগ্রগতির অপেক্ষায় রয়েছি।"
একই সঙ্গে সেতু বিভাগের উচ্চপর্যায়ে মহেশখালী-কক্সবাজার চ্যানেলে সেতু বা টানেল নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়াকে নীতিনির্ধারণী টেবিলে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দিক পর্যালোচনা করছে এবং অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ও শুরু করেছে।
অবকাঠামো প্রকৌশলীদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে একটি বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা জরুরি। সমুদ্রের তলদেশের মাটির গঠন, ঢেউ ও বাতাসের গতিপ্রকৃতি, নৌ-চ্যানেলের নাব্যতা ও নৌযান চলাচলের উচ্চতা, সম্ভাব্য নির্মাণব্যয় এবং টেকসই বিনিয়োগ মডেল এই সমীক্ষার আওতায় আসবে। এক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া দেশীয় ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা ও নদী শাসন ব্যবস্থাপনা মহেশখালী প্রকল্পে অত্যন্ত সহায়ক হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে ঘিরে মহেশখালীর গণমানুষের সামগ্রিক অধিকার ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে জোর দাবি জানিয়েছেন মহেশখালীতে বিএনপির তরুণ নেতা আ স ম জাহেদুল হক নাহিদ। তিনি বলেন, "মহেশখালীর উন্নয়ন মানেই পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। শুধু সড়ক যোগাযোগই নয়, মহেশখালীকে সামগ্রিকভাবে একটি টেকসই ও আধুনিক মডেল অঞ্চলে রূপান্তর করতে হবে। আমাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা। একই সাথে সাগরের ভাঙন থেকে এই দ্বীপের ভূখণ্ডকে বাঁচাতে মহেশখালীর চারপাশে একটি আধুনিক ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অবহেলিত প্যারাবন রক্ষার্থে এখনই কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।" তিনি আরও যোগ করেন, মাতারবাড়ি ও ধলঘাটাজুড়ে গড়ে ওঠা কোল পাওয়ার ও গভীর সমুদ্রবন্দরে বহিরাগতদের প্রাধান্য বন্ধ করে স্থানীয়দের শতভাগ চাকরি নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় আইনি নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া কালারমার ছড়া, ধলঘাটা ও হোয়ানক থেকে অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য একর প্রতি ৫১ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে নূন্যতম ১.৫ কোটি টাকা নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সুবিধার্থে উত্তর মহেশখালীকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা হোক। বর্তমানে উন্নয়নের বিএনপি সরকার এসব জনদাবী পুরণে কাজ করবেন।"
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী ও উন্নয়নকর্মীরা মনে করেন, মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু নির্মিত হলে এই অঞ্চল কেবল একটি কংক্রিটের সংযোগই পাবে না, বরং পুরো উপকূলীয় অর্থনীতির মানচিত্র আমূল বদলে যাবে। একদিকে যেমন মহেশখালীর বিখ্যাত মিষ্টি পান, লবণ, মাছ এবং শিল্পপণ্যের পরিবহন ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, অন্যদিকে বিশ্বখ্যাত পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পর্যটন খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এই সেতুটি নির্মিত হলে পর্যটকরা সহজেই মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, কুতুবদিয়ার বাতিঘর, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশ এবং সবুজ পাহাড়-সমুদ্র মিলিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দ্বীপভিত্তিক সংস্কৃতি ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোর থেকে সরাসরি মহেশখালী ও মাতারবাড়ি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হলে তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারী শিল্প স্থাপনে অতিরিক্ত উৎসাহ জোগাবে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খতিয়ানের বাইরেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জরুরি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এই সেতুর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বর্ষা মৌসুমে বা জলোচ্ছ্বাসের সতর্কবার্তা থাকলে মুমূর্ষু রোগীকে মহেশখালী থেকে জেলা সদরে বা চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর কারণ হয়। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের শহরে যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ হবে। তবে এই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সমুদ্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক মাছের প্রজননক্ষেত্র, জলপ্রবাহের প্রাকৃতিক ধারা এবং উপকূলীয় ভাঙন-গড়নের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করেই নকশা চূড়ান্ত করা বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরসহ হাজার হাজার কোটি টাকার জাতীয় প্রকল্প চলমান থাকায় স্থানীয়রা আশাবাদী যে, এবার অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই সরকার এই সেতু নির্মাণে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। পদ্মা সেতু যেমন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, ঠিক তেমনি মহেশখালী-কক্সবাজার সেতুও বাস্তবায়িত হলে তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। আর এই গভীর আত্মবিশ্বাস থেকেই আজ মহেশখালীর মানুষের কণ্ঠে একই স্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- “স্বপ্নের সেতু চাই, স্থায়ী সংযোগ চাই”।