মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
কক্সবাজারবাসীর প্রতি এত নির্দয় ও বিরূপ মন্তব্য কেন। সংসদে বিরোধী দলের মাননীয় সংসদ সদস্যরা বলছেন সব ইয়াবা, মাদক ইত্যাদি কক্সবাজার জেলার উপর দিয়ে বাংলাদেশে পাচার বা আনা হচ্ছে। কক্সবাজার জেলায় প্রায় ১৪ লাখ আশ্রিত রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে কক্সবাজারবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা,অর্থনীতি,আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার মারাত্মক ক্ষতি করছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন রাজধানীতে বসবাসকারী ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দরা। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাদেরও খাওয়াতে পারব ইনশাল্লাহ বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসতে উৎসাহীত করেছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । বাংলাদেশের সরকার প্রধানের এই আবেগপ্রবণ ঘোষণায় সুযোগের অপেক্ষায় থাকা রোহিঙ্গামুসলমান বিদ্বেষী মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী , আরাকান আর্মি ও উগ্র রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের উপর পাইকারী হারে নির্মম নির্যাতন বাড়িয়ে দিয়ে তাদের জন্মভুমি আরাকান রাজ্য ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে উদ্ভুদ্ধ করেছিল। ইয়াবা, মাদক বাংলাদেশের মানুষ সেবন করেন বিধায় তা চোরাই পথে আমদানী করা হয়। গতকাল শনিবারের দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার সংবাদ প্রকাশ হয়েছে যে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ১লাখ ৬১ হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। আগে ব্যাপক প্রচারণা ও বিশ্বাস ছিল টেকনাফের সাবেক এমপি বদির নেতৃত্বে দেশে সব ইয়াবা চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করা হয়। এখন বদি প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে আটক ও তার দলীয় লোকজন এবং আত্মীয়স্বজনরাও বাড়ীঘর ছেড়ে পলাতক। এখন প্রতি দিন লাখ লাখ পিছ ইয়াবা যে জব্দ করা হচ্ছে তা কে বা কারা দেশে আমদানী করছেন। প্রকৃত সত্য কথা হল ইয়াবা বা মাদকের চাহিদা দেশে আছে বলেই যে কোনভাবে মাদক পাচার হয়ে আসছে। বাস্তবতা হলো মাদক পাচারকারীরা ধৃত হয়ে বিচারে দন্ডিত হয়ে কারাগারে থাকলেও অতি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে নতুন নতুন পাচারকারী, মাদক ব্যবসায়ী সৃষ্টি হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। তবে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ের অভিযোগ খুবই লজ্জা ও হতাশাজনক। প্রতি দিন হত্যা,ধর্ষণ,চুরি-ডাকাতি,ছিনতাই, মারামারি,গুলাগুলি,বাড়ীঘর ভাংচুর,লুটপাট ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঘটনার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার অনুমান ৭০% এর পিছনের কারণ হল মাদকাসক্তি বা মাদক ব্যবসা। মাদকসেবন,মাদকাসক্তি বন্ধ করা গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাদক ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যাবে। মাদক সেবনের বা মাদক ক্রয়ের লোক না থাকলে আমদানী করা মাদক ব্যবসায়ীরা সাগরে, নদীতে ফেলে দিতে বাধ্য হবে। তখন কেউ আর চোরাই পথে মাদক আমদানী করার ঝুকি নেবেন না। বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর সমস্যা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকতায় ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়ার সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মাদকাসক্ত লোক আছে। প্রায় প্রতি দিন সংবাদপত্রের পাতায় দেশের কোন না কোন জায়গায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের খবর দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে যে পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদক চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করা হয় তার অনুমান ১০% ভাগ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধৃত হয়। বাকী ৯০% দেশে নিরাপদে প্রবেশ করে এবং ব্যবহার হয়। মাদকের বিরুদ্ধে সকল সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হলেও তা বন্ধ হয় নাই। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আমদানী বা পাচার বন্ধ করার অজুহাতে ওসি প্রদীপের আমলে শুধু টেকনাফ থানায় ২০৪ জন নাগরিককে ইয়াবা পাচারে সংশ্লিষ্টার অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। যারা ইয়াবা পাচার বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে নিজেরা সেই অজুহাতে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল টাকা উপার্জন করায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ডকুমেন্টারী তৈরী করতে গিয়েই মেজর(অব) সিনহাকে হত্যা করে ওসি প্রদীপ গং বিচারে মুত্যুদন্ডে ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। কিন্ত ইয়াবা পাচার এখনও অব্যাহত আছে কেন। আবারও তার উত্তর হল চাহিদা থাকলে সরবরাহ বৈধ বা অবৈধ পথে অবশ্যই আসবে, তা অর্থনীতির ধর্ম।
মাদক চোরাচালানী /আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী সংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে প্রচলিত আইন সংশোধন করে ইয়াবা সেবনকারী বা মাদক সেবনকারীদের দ্রুত সনাক্ত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি জেলায়-উপজেলায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু মাদক পাচারকারীদের ধরে বিশেষ আদালত গঠন করে মৃত্যুদন্ড,যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলে ইয়াবা আমদানী বন্ধ হবে না। সরকারী/বেসরকারী চাকুরী,স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি,ড্রাইভিং লাইসেন্স,আমদানী রপ্তানীসহ ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা পেশাজীবীদের সনদ প্রদানের সময়, রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যপদসহ নেতৃত্বের পদ দেওয়ার আগে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাথে মাদকাসক্ত নন মর্মে ডোপ-টেস্ট রির্পোট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তারা সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন বলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যাগ নিলে দেশে মাদক সেবন কঠোরভাবে নিরুৎসাহীত করা ও বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয়। হীন রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সরকারী দল ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে মাদকসেবনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মসজিদভিত্তিক, সমাজভিত্তিক, মহল্লাভিত্তিক সর্বদলীয় মাদকসেবন বিরোধী কমিটি গঠন করে চিহিৃত মাদকসেবনকারীদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। দেশের ইসলামী দলগুলো মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনে শরীক হয়ে অগ্রনী ভুমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবেন বলে আশা করা যায়। কারণ দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করেন ইসলামী দলগুলোর নেতা-কর্মীরা মাদক সেবন করেন না। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে দেশে মাদক সেবন বন্ধ করার মাধ্যমে ইয়াবা ও মাদক পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে অপরাধপ্রবণতা কমে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বাংলাদেশে মাদকের চাহিদা থাকলে,প্রায় ১৪ লাখ আশ্রিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থাকলে শত কোটি টাকা খরচ করে সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দিলেও মাদক পাচার বন্ধ হবে না। সুতরাং কক্সবাজার জেলায় জন্ম গ্রহনকারীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দোষারোপ করা অযৌক্তিক ।