যেমন ডিম ফুটার আগেই যতগুলো ডিম আছে, ততগুলো মুরগি হবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়, তেমনি কোনো কূটনৈতিক চুক্তিও স্বাক্ষর হওয়ার আগে নিশ্চিত ধরে নেওয়া উচিত নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাসকাট, তেহরান ও ওয়াশিংটন থেকে বেরিয়ে আসা বিভিন্ন তথ্য ও গুঞ্জন একই দিকেই ইঙ্গিত করছে। তা হলো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হওয়া হরমুজ প্রণালিতে কার্যত চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। এরপর থেকে উভয় পক্ষ এমন এক অচলাবস্থায় আটকে ছিল, যেখানে কেউই আগে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে রাজি ছিল না।
এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য এই চুক্তিকে অনেকেই ইতিবাচক খবর হিসেবে দেখছেন। গত পাঁচ মাস ধরে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা নাবিকরা হয়তো শিগগিরই বাড়ি ফিরতে পারবেন। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউও এড়ানো সম্ভব হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎই ছিল জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়ন নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্যের বিষয়। এই বিরোধের সমাধান হলে ওই সমঝোতার অন্যান্য বিষয়েও অগ্রগতির পথ খুলে যেতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির পক্ষ নয়, তবু এটি কার্যকর করতে ওয়াশিংটনের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে, অন্তত বড় পরিসরের যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই শেষ হতে পারে। তবে এই শান্তি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কল্পনা করেছিল, সেভাবে আসবে না। এর অর্থ হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে দুর্বল বা ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য সফল হয়নি। বরং যুদ্ধের ফলাফল ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হেরেছে, আর ইরান জিতেছে।
সম্ভাব্য হরমুজ চুক্তির খসড়াও সেই বার্তাই বহন করছে। ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে। আর বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের রুট তদারকির দায়িত্ব থাকবে ওমানের, যদিও সেই ক্ষেত্রেও ইরানের কিছু তদারকির ভূমিকা থাকবে। এছাড়া পরিবেশ, নিরাপত্তা ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে উভয় দেশ জাহাজ থেকে নির্ধারিত ফি আদায় করবে, যদিও সেই ফি এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদির ভাষায়, এই চুক্তি হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের ‘কার্যকর সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠা করবে। জুনের সমঝোতা স্মারকটি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু বিষয় অস্পষ্ট রেখেছিল এবং এটা সেই সম্ভাব্য ফলাফলগুলোর একটা ছিল।
উদাহরণ হিসেবে, সমঝোতার পঞ্চম ধারায় শুধু বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে ইরান ও ওমান আলোচনা করবে। ইরান এর অর্থ এভাবে নিয়েছে যে, তারা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ফি আদায় করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা ছিল, যুদ্ধের আগের মতো অবাধ নৌ চলাচলই আবার চালু হবে।
এই ভিন্ন ব্যাখ্যার সমাধান একসময় করতেই হতো এবং অনেকের আশঙ্কা ছিল, শেষ পর্যন্ত ইরানের অবস্থানই প্রাধান্য পাবে। তবে এর জন্য সমঝোতার খসড়া প্রস্তুতকারীদের দোষারোপ করার অর্থ নেই। কারণ শান্তিচুক্তি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র যে আবারও সামরিক হামলা শুরু করেছিল এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় উপকূলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছিল, সেটাকে যুদ্ধের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও স্পষ্টত ব্যর্থ হয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প দুই সপ্তাহব্যাপী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ব্যাপক বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় মিত্রদের হস্তক্ষেপে তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। খবরে বলা হয়েছে, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ফলে যুদ্ধের আগে যেভাবে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তার করত, এখন তার চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে।
তবে এখনও অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ওমান এখনও প্রকাশ্যে এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলেই কেবল এই চুক্তি কার্যকর হবে। ট্রাম্প চাইলে ভিন্ন ফল পাওয়ার আশায় আবারও সামরিক হামলার পথ বেছে নিতে পারেন।
গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, খুব শিগগির হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত করা হবে’। এর আগে ওয়াশিংটনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সপ্তাহের শেষ দিকেই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হতে পারে। তবে ইরান বারবার বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও নেই।
এছাড়া সমঝোতা স্মারকে আরও অনেক বিতর্কিত বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার প্রশ্ন। এসব ইস্যু এখনও শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। তবে প্রথম বড় পরীক্ষায় ইরান এগিয়ে রয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলোতেও তাদের অবস্থান শক্তিশালী থাকবে।
এসব তো গেল যুদ্ধক্ষেত্রের রায়। কিন্তু ইতিহাসের রায় কী হবে? এমনও হতে পারে যে, ভবিষ্যতে এই সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব হ্রাসের একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখা হবে। ব্রিটেনের সুয়েজ সংকটের ব্যর্থ অভিযানের মতো, যা শেষ পর্যন্ত একটি সাম্রাজ্যের পতনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
ধরুন, এই যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সত্যিকার প্রয়োজনীয় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাহলে সেটি একটি বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি। তারা যুদ্ধে সামরিকভাবে পরাজিত হয়নি এবং প্রাণহানিও খুবই কম হয়েছে। বড় শক্তিগুলো অনেক সময় এমন ধাক্কা সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।
অপরদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। তাই ইরানের এই বিজয় শেষ পর্যন্ত ‘পাইরিক বিজয়’ (অর্থাৎ এমন বিজয়, যার মূল্য অত্যন্ত বেশি) হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবুও এটি একটি বিজয়। বাস্তবতা হলো এই যুদ্ধে ইরান জিতেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র হেরেছে।