‘সম্প্রীতির জাহাজে ফানুসের আলোয়, দূর হোক সাম্প্রদায়িক অন্ধকার’ শ্লোগানে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে, কল্পজাহাজ ভাসানো উৎসব। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও রামুতে উদযাপিত হয়েছে জাহাজ ভাসানো উৎসব। রঙিন কাগজের নান্দনিক কারুকাজে বাঁশ, বেত, কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় কল্পজাহাজ। পাঁচ-ছয়টি নৌকার ওপর বৌদ্ধ প্যাগোডা, জাদী বা চূড়া, ড্রাগন, ময়ূর, সিংহসহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতির কল্পজাহাজ গুলো রোববার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাসানো হয় বাঁকখালী নদীতে। বৈচিত্র্য নির্মাণ শৈলীর আটটি কল্পজাহাজ নাচে-গানে বুদ্ধ কীর্তনে বাঁকখালী নদীর এপার থেকে ওপারে ভেসে চলে। সম্প্রীতির মহামিলন এ উৎসবে নদীর দুকূলে আনন্দে মাতোয়ারা হয় বৌদ্ধরা সহ সকল ধর্মের শত শত নরনারী।
সোমবার, ২৬ অক্টোবর রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত জাহাজ ভাসা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ। প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়াতে হবে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে এ স্পন্দন থাকতে হবে। কোন ধর্মের পরিচয়ে যদি অন্যায় হয়, মানুষের মধ্যে ফারাক তৈরীর চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা রুখে দিতে হবে। যে বাগানে একরকম ফুল থাকে সে বাগান সুন্দর হতে পারে না। যে বাগানে হরেকরকম ফুল থাকে, সে বাগান সুন্দর ও সমৃদ্ধ। তাই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর রাখতে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ ও ঐক্য বজায় রাখতে হবে।
মন্ত্রী বলেন- রামুর জাহাজ ভাসা উৎসবে এসে তিনি আবেগে আপ্লুত। কারণ এমন আয়োজন অতীতে কোথাও দেখেননি। এখানে বাঁকখালী নদীর দুই তীরে সব ধর্ম বর্ণের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমান করে এ রামু শান্তি সম্প্রীতির জনপদ। এভাবেই এদেশে পাহাড় ও সমতলের মানুষ মিলেমিশে থাকতে চায়। যার জন্য বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
রামু মৈত্রী বিহারের অধ্যক্ষ বিজয় রক্ষিত মহাথেরের আর্শীবাদক বক্তৃতায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সুকোমল বড়ুয়া উদ্বোধক এবং কক্সবাজার-০৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল প্রধান আলোচকের বক্তৃতা করেন। সভাপতিত্ব করেন রামু কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত অতিথির বক্তৃতা করেন, বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাথি উদয় কুসুম বড়ুয়া।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন- জাহাজ ভাসা উৎসব বাংলাদেশের দক্ষিণ জনপদের এক প্রান্তে হলেও এ উৎসব বাংলাদেশের সীমানাকে অতিক্রম করে বৌদ্ধ দেশ চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, লাউস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মিয়ানমারসহ বিশে^র আরও বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব ছড়িয়েছে। শত বছরের ঐহিত্যবাহী এ জাহাজ ভাসা উৎসব পরিনত হয় সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিলনমেলায়।
সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন- রামুর সম্প্রীতির সবচেয়ে সমৃদ্ধ উপজেলা। ২০১২ সালে এখানে বৌদ্ধ বিহারে সংগঠিত সহিংস ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ অনুযায়ি তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের বেশী সম্পৃক্ত দেখা গেছে। কিন্তু পরবর্তী তদন্তের নামে মিথ্যা মামলায় অনেক নিরীহ লোকজনকে হয়রানি করা হয়েছিলো। এ ঘটনাং প্রকৃত আসামী যাতে পার না পায় এজন্য প্রকৃত আসামীদের পূনঃতদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি জোরালোভাবে জানাবেন বলেও জানান তিনি।
উৎসব আয়োজকরা জানান, রামু উপজেলার হাইটুপি, শ্রীকুল, পূর্ব মেরংলোয়া, উত্তর মিঠাছড়ি, হাজারীকুল, দ্বীপ শ্রীকুল, পূর্ব রাজারকুল ও পশ্চিম মেরংলোয়া গ্রামের সাতটি কল্পজাহাজ ভাসানো হয় নদীতে।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ জানান, প্রায় ২৫০ বছর আগে তৎকালীন ধনাঢ্য রাখাইন বৌদ্ধরা প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে প্রাচীন রামুর বাঁকখালী নদীতে কল্পজাহাজ ভাসানো প্রচলন শুরু করেন। জাহাজভাসা উৎসবের প্রচলন হয় পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে মুরহন ঘা নামক স্থানে একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসব উদযাপন করা হয়। শতবছর ধরে প্রবারণা পূর্ণিমায় রাখাইন ও বড়ুয়া সম্প্রদায় বাঁকখালী নদীতে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব আয়োজন করে আসছে। রামুর এ জাহাজ ভাসা উৎসব বৌদ্ধদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হলেও, কালক্রমে সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে সম্প্রীতির মহামিলন উৎসবে উদযাপিত হয়।
কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, 'গৌতম বুদ্ধের সময় ভারতবর্ষে বৈশালী ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। একসময় ওই রাজ্যে ত্রিবিধ উপদ্রব দেখা দিল। দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও অমনুষ্যের উপদ্রব। হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতিকে অমলিন করে ধরে রাখার জন্য রামুতে সর্বপ্রথম রাখাইন বা মগদের দ্বারা কাগুজি কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের সৃষ্টি হয়।'