মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
আল্লাহ সকলকে তার নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যু দান করেন। তাঁর হুকুম ব্যতীত কেউই মৃতুবরণ করতে পারে না (আল-কোরআন)। মানুষের মৃত্যু না হলে বেঁচে থাকার কোন মর্যাদাই থাকত না। পবিত্র আল-হাদিসে উল্লেখ আছে, পার্থিব সুখ বিনাশকারী মৃত্যুর কথা সর্বদা স্মরণ করিও। মৃত্যু মুসলমানদের নিকট উপঢৌকন স্বরূপ- মৃত ব্যক্তিদেরকে সর্বদা স্মরণ করিও, তাদের গুণকীর্তন করিও এবং তাদের সম্পর্কে মন্দ বাক্য বলিও না। জীব মাত্রই একদিন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহন করবে। সে ধীর গতিতে আসুক বা দ্রুত গতিতে আসুক অবশেষে সে চির সত্য মৃত্যু একদিন আসবেই।
দেখতে দেখতে ৪ বছর হয়ে গেল আবু বকর মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিকী গত ১৫ অক্টোবর ২০২২ বিকেল সাড়ে পাঁচ টার সময় ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী সাহেলা পারভিন,তিন কন্যা-তাসপিয়া সিদ্দিকী,মাইসা সিদ্দিকী,ওমায়দা সিদ্দিকী, চার ভাই, সাত বোন, বহু আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব রেখে গেছেন। ঐ দিন রাত সাড়ে দশ টার সময় সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি,এডভোকেট ও অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের অংশগ্রহনে ঢাকায় তার প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আপিল বিভাগের বিচারপতি এনায়েতুর রহিম,বিচারপতি হাসান আরিফ,বিচারপতি মোহাম্মদ আলী, মন্ত্রী এডভোকেট মাহবুব আলী, এডভোকেট জাহেদুল বারী, এডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুকুল,এডভোকেট মুরাদ রেজা সহ অনেকে জানাজার নামাজে শরীক হন। বিচারপতি বিশ্বজিতও মরহুম আবু বকরকে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য তথায় উপস্থিত ছিলেন। কক্সবাজার জেলার পেকুয়া থানাধীন তাদের জমিদারবাড়ী মসজিদ প্রাঙ্গণে ১৬ অক্টোবর আসরের নামাজের পরে তার শেষ জানাজার নামাজ শেষে তার পিতা মরহুম এডভোকেট ফিরোজ আহমদ চৌধুরীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। কক্সবাজার থেকে আমরা তার স্কুল জীবনের পাঁচ বন্ধু আমি,অধ্যক্ষ ওমর ফারুক, অধ্যাপক শহিদুল্লাহ,মফিজ কোম্পানী ও জহির আহমদ তার জানাজায় শরীক হয়ে তাকে দাফন করা পর্যন্ত উপস্থিত ছিলাম।
মরহুম এডভোকেট আবু বকর সিদ্দিকীকে আমি সারা জীবন ডাকনাম ’মনু’ বলে ডাকতাম এবং ’তুই’ বলেই সম্বোধন করতাম। মৃত্যুর পর সম্মান করে ’তিনি’ লিখছি। কক্সবাজার এন্ডারসন রোডে তার বাসা,অধ্যাপক শহিদুল্লাহর বাসা ও আমাদের বাসা পাশাপাশি ছিল। আমরা কক্সবাজার সেন্ট্রাল প্রাইমারী স্কুলে এক সাথে স্কুল জীবন শুরু করি। কক্সবাজার হাইস্কুল থেকে ১৯৬৯ সালে বকর মানবিক ও আমি বাণিজ্য বিভাগে এসএসপি পাশ করি। বকর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম ব্যাচের ম্যানেজমেন্ট বিভাগে সম্মান সহ বি,কম ও এম,কম পাশ করেন। তারপর আমেরিকা গিয়ে ১৯৮২ সালে ’এটর্ণী এট ল’ ও ক্রিমিনোলজির ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রী গ্রহন করেন। সেখানে বাংলাদেশ এম্বেসীতে পরীক্ষা দিয়ে এডভোকেট আহাসানুল হক হেনা ও বকর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ১৯৮০ সালে এলএলবি পাশ করে বাংলাদেশে ফিরে এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে হেনা ও বকর ১৯৮৬ সালে এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
আমি ও বন্ধু নজরুল ইসলাম চট্টগ্রাম গর্ভেন্ট কর্মাস কলেজে পড়তাম ও হোস্টেলে থাকতাম। বকর চট্টগ্রাম কলেজে পড়তেন এবং নিউ হোস্টেলে থাকতেন। ১৯৭১ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করে আমরা মার্চের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার বাড়ীতে চলে আসি নিরিবিলি পরিবেশে ভাল করে লেখাপড়া করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। তখন হোস্টেলের ছাত্রদের নিয়েই প্রতি দিন মিটিং মিছিল হতো বিধায় হোস্টেলে লেখাপড়ার পরিবেশই ছিল না। ১৯৭১ সালের শেষ সপ্তাহে আমরা খবর পাই যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ব্যাংগল রেজিমেন্টের মেজর শওকত (মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী) বিদ্রোহ করে তার বাহিনী নিয়ে কক্সবাজার চলে এসে জেলা পরিষদের বাংলায় অবস্থান করছেন। রাগেব আহসান ফকরি গণি প্রকাশ রাগেব ( এডভোকেট এখলাছুল কবিরের পুত্র) তখন চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতিতে অর্নাসের ফাইনেল ইয়ারের ছাত্র। তার প্রস্তাবে বকর ও আমি তার সাথে মেজর শওকতের সাথে দেখা করতে যাই। মেজর শওকত আমাদের জানালেন যে ব্যাংগল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াও বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার বাহিনী নিয়ে কক্সবাজারের দিকে আসছেন। পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের ছাড়বে না। আমাদের সঙ্গে আপনাদের যুবকদেরও ব্যাপক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। তখন রাগেব ভাই ও বকর বলেন যে তাদের চট্টগ্রাম কলেজের ইউওটিসির রাইফেল ট্রেনিং আছে। উৎসাহী যুবকদের অনতিবিলম্বে রাইফেল টেনিং দেওয়ার জন্য মেজর শওকত নির্দেশ দেন। পরের দিন থেকে আবু বকর সিদ্দিকী, রাগেব ও মোস্তফা অনেক স্থানীয় যুবককে কক্সবাজার প্রিপ্রেটারী স্কুল মাঠে ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কক্সবাজার প্রবেশ করার আগেই সকলে আত্মগোপনে চলে যান। পাকিস্তানী বাহিনী কক্সবাজার এসে বকরের পিতা এডভোকেট ফিরোজ আহমদ চৌধুরী,তার পুত্র ওসমান চৌধুরী ও মোস্তফা আলী রেজা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান। আবু বকরের বড় ভাই এজাজুল ওমর চৌধুরী প্রকাশ ভাট্টু মিয়া ছাত্রলীগের ক্যাশিয়ার ছিলেন বিধায় তার নিকট আন্দোলনের টাকা পয়সা ও অস্ত্রশস্ত্র লালদীঘির পাড়ের বাসায় জমা রাখা হতো। তখন স্বাধীনতা সংগ্রামী কৃঞ্চ প্রসাদ বড়ুয়া,পরিমল, প্রিয়তোষ পাল পিন্টু ও অন্যরা তাদের বাসায় খাওয়া দাওয়া করতেন ও রাত্রি যাপন করার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে ফিরোজ আহমদ চৌধুরীকে ব্যাপক নির্যাতন করে পাকিস্তানী সেনারা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার আবু বকর সিদ্দিকীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গ্যাজেট করে তালিকাভুক্ত করে ও সার্টিফিকেট প্রদান করে।
বকরের বড় মেয়ে তাসপিয়া সিদ্দিকী বিবিএ পাশ করার পর বিয়ে হয়। সে এখন স্বামী সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থাকে। মাইসা সিদ্দিকী ইংরেজী সাহিত্যে এম,এ পাশ। বিয়ে হয়েছে ও দুই সন্তানের মা, যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। ছোট মেয়ে ওমায়দা সিদ্দিকী এলএলবি অনার্স পাশ করে এখন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংকে চাকুরী করে এবং আগামী ১১ নভেম্বর কম্পিউটার প্রকৌশলীর সাথে যুক্তরাষ্ট্রে তার বিয়ে হবে ইনশাল্লাহ। বকর অত্যন্ত বন্ধুসৎসল ছিলেন। নব্বই দশকে প্রতি বছর ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী বন্ধুদের নিয়ে সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে আসতেন। তখন আমার বাসায়ও আসতেন। তার বন্ধুবান্ধবদের অনেকে সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি,সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। বকরের মাধ্যমে অনেকের সাথে আমারও বন্ধুত্ব হয়েছে। আবু বকর সিদ্দিকী একজন সহজ,সরল,পরোপকারী ভালো মানুষ ছিলেন। সকলের আপদে বিপদে অসুখে এগিয়ে যেতেন। আমার বড় মেয়ে লিমা ঢাকা লালমাটিয়া মহিলা কলেজে এইচএসসি ক্লাসে ভর্তি হলে হোস্টেলে সিট না পাওয়া পর্যন্ত আমিসহ প্রায় দেড় মাস বকরের বাসায় ছিলাম। আমার তিন সন্তান বকরের তিন সন্তানের সমবয়সী। বকরের স্ত্রী আত্মীয়স্বজন ও বকরের বন্ধুর পরিবারদের নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে বেশী পছন্দ করতেন। বকরের পিতা আলহাজ্ব ফিরোজ আহমদ চৌধুরী ১৯৫৪ সালের নির্বাচিত এমএলএ এবং কক্সবাজার জেলার প্রথম পাবলিক প্রসিকিউটর ছিলেন। তার শ্বশুর ডাক্তার এম,এ মন্নান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার শ্বাশুরী হাছিনা মান্নান চট্টগ্রামের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। বকর গত দশ মাস ধরে খুবই অসুস্থ ছিলেন। তার বেশ কয়েকবার অপারেশন হয়েছে। স্ত্রী সাহেলা পারভিন হাসপাতালে,বাসায় সব সময় স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর সাথে থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সেবাযত্ন করেছেন। মা-বাবা উভয়েই সংসদ সদস্য ও বড় লোকের উচ্চ শিক্ষিত অতি আদরের প্রথম মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও স্বামীকে বুয়া বা বাবুর্চির রান্না করা খাবার খাওয়ান নি। বকরের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিরহংকারী সাহেলা পারভিন সব কিছু নিজ হাতে করেছেন। মেঝ মেয়ে ও ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বকরের লাশের সাথে ঢাকা থেকে পেকুয়া এসে দাফন করা পর্যন্ত স্বামীর সাথে সাথে ছিলেন। আমাদের বন্ধুবান্ধবদের স্ত্রীদের মধ্যে আবু বকর সিদ্দিকীর স্ত্রী মহিয়সী নারী সাহেলা পারভিনকে আমরা সেরা স্বামীভক্ত, দায়িত্বশীল ও দরদী স্ত্রী হিসেবে স্যালুট করি।
আল্লাহ আপনি মরহুম আবু বকর সিদ্দিকীকে তার ভাল আমলগুলো কবুল করে বেহেস্তে নসীব করুন এবং তার স্ত্রী কন্যাদের শোক সইবার ক্ষমতা দিয়ে সসম্মানে সুস্থ শরীর নিয়ে দীর্ঘায়ু দান করুন। আমিন।