মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
দেশে-বিদেশ বাংলাদেশের সব চেয়ে আলোচিত বিষয় হল রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে এজাহার দায়ের,আসামী গ্রেপ্তার,মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দায়ের,বিচারিক আদালতে সোহেল-স্বপ্না দম্পতি আসামীর পক্ষে কোন আইনজীবী উকালতি করতে সম্মত না হওয়ায় রাষ্ট্রের খরচে ও উদ্যোগে আসামীদ্বয়ের পক্ষ সমর্থন করে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ,সাক্ষীদের সাক্ষ্যজেরা গ্রহন সমাপ্ত করে আসামীদ্বয়কে তাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়ে, সাফাই সাক্ষী দিবে কিনা জিজ্ঞাসা করে,আসামীপক্ষের ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানী করে উভয় আসামীকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডাদেশ অনুমোদন করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে নথী প্রেরণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেই মৃত্যুদন্ডাদেশের উপর রেফারেন্স দ্রুত শুনানী ও নিস্পত্তি করার জন্য প্রধান বিচারপতি একটি ব্যাঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় মূল আসামী সোহেল মাদকাসক্ত ছিলেন। কক্সবাজার জেলার রামু থানাধীন খুনিয়াপালংয়ে আয়াছ(৬৫) নামের এক হতভাগ্য পিতা নিজের বড় ছেলে মোঃ জুবায়ের এর ছোড়া গুলিতে নিহত হয়েছেন। অস্ত্রধারী মোঃ জুবায়ের ইয়াবা ব্যবসায়ী । প্রতি দিন হত্যা, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, মারামারি, গোলাগুলি, বাড়ীঘর ভাংচুর, লুটপাট ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঘটনার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার অনুমান ৭০% এর পিছনের কারণ হল মাদকাসক্তি বা মাদক ব্যবসা। মাদকসেবন, মাদকাসক্তি বন্ধ করা গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। আগে প্রচার ছিল মাদক সম্রাট বদির নেতৃত্বে ইয়াবাসহ সব মাদক মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করা হয়। তার পরিবারও মাদক ব্যবসায় জড়িত। কিন্তু গত দেড় বছরের অধিক সময় ধরে বদি কারাগারে আটক আছেন। তার দলীয় লোকজন ও আত্মীয়স্বজনরাও বাড়ীঘর ছাড়া পলাতক আছেন। প্রতি দিন পত্রিকায় চোখ দিলেই দেখা যায় দেশের কোন না কোন স্থান থেকে হাজার হাজার,লাখ লাখ পিচ ইয়াবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী উদ্ধার করেছেন। প্রশ্ন হল, এখন উদ্ধার হওয়া ইয়াবা বা মাদকদ্রব্য কে বা কারা চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করছেন। প্রকৃত সত্য কথা হল ইয়াবা বা মাদকের চাহিদা দেশে আছে বলেই যে কোনভাবে মাদক পাচার হয়ে আসছে এবং নতুন নতুন পাচারকারী,মাদক ব্যবসায়ী সৃষ্টি হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর সমস্যা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকতায় ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়ার সমস্যা। প্রায় প্রতি দিন সংবাদপত্রের পাতায় দেশের কোন না কোন জায়গায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের খবর দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে যে পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদক চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করা হয় তার অনুমান ১০% ভাগ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধৃত হয়। বাকী ৯০% দেশে নিরাপদে প্রবেশ করে এবং ব্যবহার হয়। মাদকের বিরুদ্ধে সকল সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হলেও তা বন্ধ হয় নাই। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আমদানী বা পাচার বন্ধ করার অজুহাতে ওসি প্রদীপের আমলে শুধু টেকনাফ থানায় ২০৪ জন নাগরিককে ইয়াবা পাচারে সংশ্লিষ্টার অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। যারা ইয়াবা পাচার বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে নিজেরা সেই অজুহাতে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল টাকা উপার্জন করায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ডকুমেন্টারী তৈরী করতে গিয়েই মেজর(অব) সিনহাকে হত্যা করে ওসি প্রদীপ বিচারে মুত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। কিন্ত ইয়াবা পাচার এখনও অব্যাহত আছে কেন। আবারও তার উত্তর হল চাহিদা থাকলে সরবরাহ বৈধ বা অবৈধ পথে অবশ্যই আসবে। মাদক চোরাচালানী /আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী সংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির ধর্ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে প্রচলিত আইন সংশোধন করে ইয়াবা সেবনকারী বা মাদক সেবনকারীদের দ্রুত সনাক্ত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি জেলায়-উপজেলায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু মাদক পাচারকারীদের ধরে মৃত্যুদন্ড,যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলে ইয়াবা আমদানী বন্ধ হবে না।
সরকারী/বেসরকারী চাকুরী,স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স,আমদানী রপ্তানীসহ ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা পেশাজীবীদের সনদ প্রদানের সময়, রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যপদসহ নেতৃত্বের পদ দেওয়ার আগে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাথে মাদকাসক্ত নন মর্মে ডোপ-টেস্ট রির্পোট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তারা সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন বলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যাগ নিলে দেশে মাদক সেবন কঠোরভাবে নিরুৎসাহীত করা ও বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয়। সরকারী দল ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে মাদকসেবনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দেশের ইসলামী দলগুলো মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনে শরীক হয়ে অগ্রনী ভুমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবেন বলে আশা করা যায়। কারণ দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করেন ইসলামী দলগুলোর নেতা-কর্মীরা মাদক সেবন করেন না। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে দেশে মাদক সেবন বন্ধ করার মাধ্যমে ইয়াবা ও মাদক পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে অপরাধপ্রবণতা কমে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম কক্সবাজার সফর করছেন ১৩জুন থেকে। তাঁর কাছে কক্সবাজারবাসীর অনেক দাবী,অনেক চাওয়া, অনেক প্রত্যাশা আছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত লবণের মধ্যে অধিকাংশ কক্সবাজার জেলায় উৎপাদিত হয়। লবণচাষীরা দু'বেলা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার মত করে সরকারীভাবে লবণের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা হউক। উখিয়া-টেকনাফ উপজেলাকে মরুকরণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ আশেপাশের এলাকায় গভীর নলকুপ স্থাপন করে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ করে নাফ নদীর পানি শোধন করে রোহিঙ্গাদের জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হউক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় দুইবার যেভাবে বাংলাদেশে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল সেভাবে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে কক্সবাজার অঞ্চলের গাছগাছালি,পাহাড়পর্বত,পরিবেশ,স্থানীয়দের জীবনযীবিকা, দেশের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা হউক।