বিশ্বের সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে লাখো মানুষের জীবন। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতিগুলো বর্ষার টানা বৃষ্টিতে হয়ে উঠছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবছরই ধসে ঘটছে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি। শিবিরবাসীরা বলছেন, বৃষ্টি নামলেই বাড়ে আতঙ্ক। তবে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং মেগাক্যাম্প— যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এই আশ্রয়শিবিরের ৪ নম্বর ক্যাম্পে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত বসতি। বর্ষার টানা বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ঢাল, ধসে পড়ছে মাটি। ঝুঁকি কমাতে বালুভর্তি বস্তা ও ত্রিপল ব্যবহার করা হলেও পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না ধস। ফলে প্রতিটি ভারী বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা, আর জীবনঝুঁকি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা।
ক্যাম্প—৪ এর বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, “বৃষ্টি হলেই ভয় লাগে। কারণ পাহাড় ধসে পড়ে। তাই রাতে জেগে থাকি।”
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, “ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে পড়ে। এটা প্রতিবছরই হয়। পাহাড়ের ওপর থাকি, ছেলে—মেয়েদের নিয়ে সবসময় ভয়ে থাকি।”
শুধু ক্যাম্প—৪ নয়, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অন্তত ৮টি ক্যাম্প রয়েছে পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য বসতিতে বাস করছেন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বর্ষায় টানা ভারী বর্ষণ হলেই বাড়ছে তাদের উদ্বেগ। যে কোনো সময় বড় ধরনের পাহাড় ধসের আশঙ্কায় আতঙ্কে রয়েছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা।
ক্যাম্প ৯ এর বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন বলেন, “পাহাড়ের উপর ঘর নির্মাণ করেছি। এখন পাহাড়ের উপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় পাহাড় ধসে পড়বে ভয়ে থাকি।”
একই ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা সিরাজ বলেন, “বৃষ্টি হলেই তো ভয়। পাহাড় ধসে পড়বে এই আশঙ্কায় থাকি।”
ক্যাম্প—১০ এর সি ব্লকের বাসিন্দা দিলদার বেগম বলেন, “ক্যাম্পের জীবন বেশি কষ্টের। কারণ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাস করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই আমরা খুবই ভয়ের মধ্যে আছি।”
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা ছৈয়দ আলম বলেন, “ক্যাম্পে তো জায়গা কম, খুবই ঘনবসতি। এখন পাহাড়ে না থেকে যাবে কোথায়?”
ঘনবসতি ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বাড়ছে ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে আরও সহায়তা বাড়াতে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, ক্যাম্পগুলো খুবই ঘনবসতিপূর্ণ, আর জনসংখ্যাও বাড়ছে। আমরা দেখছি অনেক মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেখানে আসলে তাদের থাকা উচিত নয়। কেউ পাহাড়ের ঢালে থাকছেন, যেখানে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। আবার কেউ এমন এলাকায় থাকছেন, যা আজকের মতো ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এটি একটি বড় সমস্যা। এর কিছু সমাধান ক্যাম্পের অবকাঠামো ও পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। তবে আমরা দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি, আগাম সতর্কবার্তা এবং ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন কাজও করছি। আমরা দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই, যেন তারা এসব উদ্যোগে সহায়তা অব্যাহত রাখে। শুধু জরুরি সাড়ার জন্য নয়, ঝুঁকি কমানো এবং দুর্যোগ প্রতিরোধেও বিনিয়োগ করা জরুরি। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ক্ষতি ও খরচ দুটোই কমানো সম্ভব।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানিয়েছে, ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। গত বছর এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, এবারও তা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।