মহেশখালীবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও প্রাণের দাবী ‘মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু’ নির্মাণে এবার চূড়ান্ত প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের একটি শক্তিশালী আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) প্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী সরাসরি সচিবকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার পর বিষয়টির দ্রুত কর্মতৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। দাপ্তরিক নির্দেশনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে সেতু বিভাগের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল আগামী ১৬ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) প্রস্তাবিত সেতু এলাকা সরজমিনে পরিদর্শনে আসছেন।
গতকাল দুপুরে সেতু বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব আব্দুর রউফ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদকে এই প্রতিনিধি দলের মহেশখালী সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে সেতু মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও সহযোগিতার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ এই দলটি প্রস্তাবিত সেতুর মহেশখালী ও কক্সবাজার- উভয় প্রান্তের ভৌগোলিক অবস্থান, মাটির গুণাগুণ এবং কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করবেন বলে জানা গেছে।
প্রতিনিধি দলের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগেই এমপি আলমগীর ফরিদ প্রস্তাবিত সেতুর নকশা ও সম্ভাব্য ব্যয়ের বিষয়ে একটি কৌশলগত প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তিনি মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানিয়েছেন যেন কক্সবাজার বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার সাথে মহেশখালীর সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হয়। তাঁর মতে, এই রুটে সংযোগ স্থাপন করা হলে সেতুর দৈর্ঘ্য ও নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং যাতায়াতের সময়ও অনেকটা সাশ্রয় হবে।
গত ২ এপ্রিল সেতু মন্ত্রী বরাবর জমা দেওয়া ওই ডিও লেটারে মহেশখালীর ৬ লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও যাতায়াত সংকটের চিত্র অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটে ওঠে। পত্রে তিনি দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ তুলে ধরেন। বিশেষ করে মাতারবাড়ি-ধলঘাটা গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ফলে মহেশখালী বর্তমানে দেশের ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির প্রধান হৃৎপিণ্ডে পরিণত হয়েছে- এই বিষয়টি তিনি যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেন।
ডিও লেটারে এমপি আলমগীর ফরিদ আরও আক্ষেপ করে বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে মহেশখালীর অবদান অনস্বীকার্য হলেও জেলা সদরের সাথে এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও মান্ধাতা আমলের এবং অত্যন্ত বিপদসংকুল। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে যাতায়াত করতে হয় এবং প্রতি বছরই এই পথে মর্মান্তিক নৌ-দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে। ৬ লক্ষ মানুষের এই চরম ভোগান্তি নিরসনে একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ সেতু নির্মাণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। জনগণের এই প্রাণের দাবি পূরণ করাই ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারের প্রধান অঙ্গীকার এবং নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি একে তাঁর মেয়াদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
সচেতন মহল মনে করছেন, চিঠির ওপর মন্ত্রীর সচিত্র মন্তব্য এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার এই প্রকল্পটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। মাতারবাড়ি মেগা প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ সুফল ঘরে তুলতে এবং দ্বীপ জনপদকে আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে এই সেতুর কোনো বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ এমপি জানান, মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি এই অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের ভাগ্য বদলে দেওয়ার প্রধান সোপান। তিনি আরও জানান যে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি অব্যহত চেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন। প্রতিনিধি দলের এই সফরের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের এই সেতুর কাজ বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।