কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেলের ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী নদীর মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলনের ওপর চার মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এসব এলাকা থেকে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন জনস্বার্থে মহেশখালী চ্যানেল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (রিট পিটিশন নং: ৯৯৫৫/২০২৬) দায়ের করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর (২০২৬) এ আদেশ দেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত মহেশখালী চ্যানেলের ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন থেকে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার মাসের জন্য বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে বিবাদীদের প্রতি নোটিশ জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মহেশখালী উপজেলার হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে বালু উত্তোলনের জন্য 'টোকিও-এমআইএল জেভি' নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সেই অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ১২ ধারা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে মহেশখালী চ্যানেল, আদিনাথ পাহাড় সংলগ্ন মোহনা এবং বাঁকখালী খালের মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করছে।
রিটকারী সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, “হাইকোর্টের আদেশের কপি গত ৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা প্রশাসককে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে অবগত করেছি। মহেশখালী একটি দ্বীপ উপজেলা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে নিয়ম লঙ্ঘন করে মহেশখালীর মোহনা এবং আদিনাথ পাহাড়ের নিচ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে দ্বীপের স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই সরকারি অনুমোদন ও শর্ত মেনেই দেশের উন্নয়ন কাজ হোক। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে এবং অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, “হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে এখনো অফিসিয়ালি কোনো নির্দেশনা হাতে পাইনি। নির্দেশনা পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বলেন, “মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের বিষয়টি অবগত হয়েছি। আদেশের কপিটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জানা যায়, মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের জন্য 'টোকিও-এমআইএল জেভি' কার্যাদেশ পায়। ওই প্রকল্পের প্রয়োজনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিকে ১৩টি শর্তে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও তারা বেশিরভাগ শর্তই মানছে না। অনুমোদনে ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজার ব্যবহারের কথা থাকলেও তারা ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করছে। এছাড়া অন্যতম শর্ত হিসেবে পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা না করেই দেদারসে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২১ জুলাই পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয় ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮০ টাকা জরিমানা করেছিল। তবে জরিমানার পরও তাদের বালু উত্তোলন অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বর্তমানে হাইকোর্টের এই চার মাসের নিষেধাজ্ঞার ফলে মহেশখালী চ্যানেলের ওই দুই মোহনা থেকে বালু উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা। এখন আদালতের এই সুস্পষ্ট আদেশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা।