বঙ্গোপসাগর উত্তাল। জারি রয়েছে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত। সাধারণত ভাটার সময় সাগরের ঢেউ অনেকটাই স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও বায়ুচাপের প্রভাবে ভাটার সময়ও কক্সবাজার সৈকতে আছড়ে পড়ছে ৬ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার ভয়ঙ্কর ঢেউ। প্রাণঘাতী এই ঝুঁকি উপেক্ষা করে সমুদ্রস্নানে মেতে উঠেছেন পর্যটকরা। নিরাপত্তাকর্মীদের বারবার সতর্কবার্তা, বাঁশির সংকেত-কিছুই যেন মানছেন না তারা। জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে চলছে গোসল, ছবি তোলা আর উচ্ছ্বাস।
উত্তাল সাগরের বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসছে তীরের দিকে, আঘাত হানছে বালিয়াড়িতে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ উঁচু এসব ঢেউ সৈকতে তৈরি করেছে আতঙ্কের পরিবেশ। তবে সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মাঝেও ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে সমুদ্রস্নানে মগ্ন ভ্রমণপিপাসুরা।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মোহাম্মদ উসমান বলেন, বর্তমানে সাগরে প্রায় ৬ থেকে ৭ মিটার উচ্চতায় ঢেউ ও পানির প্রবাহ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ সময়ের তুলনায় ঢেউয়ের উচ্চতা ও গতি এখন অনেক বেশি।
তিনি জানান, পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে প্রবল বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় ঢেউগুলো স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে এলোমেলোভাবে ভেঙে পড়ছে। ফলে সাগর আরও বেশি উত্তাল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে সরজমিনে সৈকতের লাবনী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়-উঁচু উঁচু ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সৈকতের বালিয়াড়িতে। অথচ তাতে যেন তোয়াক্কা নেই অনেক পর্যটকের। কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন, কেউ আবার পানিতে গড়াগড়ি দিয়ে উপভোগ করছেন উত্তাল সমুদ্র।
অনেকের ভাষ্য-ভ্রমণে এসে এত নিয়ম মানলে আনন্দ কোথায়! তাই ঝুঁকির মাঝেও উপভোগ করছেন প্রকৃতির উত্তালরূপ।
সাভার থেকে আসা পর্যটক দম্পতি রিয়াজ ও রুনা বলেন, প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসেছি, তাই মনের মধ্যে একটু ভয় কাজ করছে। তবে এই বৃষ্টি-বৃষ্টি আবহাওয়া আর উত্তাল সমুদ্রের সৌন্দর্য বেশ উপভোগ করছি। এখন কালবৈশাখীর সময়, তাই সমুদ্র এমন উত্তাল থাকাটা স্বাভাবিক। ভয় তো আছেই, কিন্তু আনন্দের এই মুহূর্তটাকে উপভোগ করতেই এসেছি-আর সেটাই করছি।
নোয়াখালী থেকে আসা পর্যটক রিদুয়ান বলেন, সমুদ্র অনেক উত্তাল, তাই ভয় লাগছে। এ কারণে বাচ্চাকে নিয়ে পানিতে নামছি না, শুধু সৈকতে একটু হাঁটাহাঁটি করছি। তবে পরিবেশটা অনেক ভালো লাগছে-প্রচুর বাতাস, সুন্দর আবহাওয়া-সব মিলিয়ে উপভোগ করছি। কিন্তু পানিতে নামতে এখনও ভয় লাগছে।
ঢাকার বনানী থেকে আসা পর্যটক মো. হায়দার আলী বলেন, সবাই মূলত আনন্দের জন্যই এখানে আসে। ঝুঁকি থাকলেও অনেকেই তা উপেক্ষা করে আনন্দ উপভোগ করতে চান। আমরাও আনন্দ করার জন্য এসেছি। আসার আগে এমন পরিস্থিতি হবে, সেটা জানতাম না। আগেই পরিকল্পনা করে এসেছিলাম, তাই সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই ঘুরতে আসা।
তিনি বলেন, আমরা সমুদ্রের এই সৌন্দর্য আর আনন্দ উপভোগ করছি। ঢেউ যত বড়ই হোক, আমরা বেশি দূরে যাচ্ছি না; কাছাকাছি থেকেই সময় কাটাচ্ছি। লাইফগার্ডরা বারবার সতর্ক করছে, বড় বড় ঢেউ আসছে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। তাই নিরাপত্তার কথা ভেবে দূরে না গিয়ে কাছেই অবস্থান করছি।
এদিকে বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের প্রভাবে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে বাতাসের গতিবেগও। চারদিকে মেঘলা আকাশ, মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকদের সমুদ্রস্নান থেকে বিরত রাখতে বাঁশি বাজিয়ে সতর্ক করছেন লাইফ গার্ড কর্মীরা। তবুও অনেকে সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করছেন। ফলে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়িয়েছে লাইফ গার্ড কর্তৃপক্ষ।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মোহাম্মদ উসমান বলেন, হঠাৎ সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠায় এবং ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় সকাল থেকেই লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতে পর্যটকদের নিরাপদে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। লাইফগার্ড সদস্যরা হুইসেল ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করছেন।
তিনি বলেন, অনেক পর্যটক সতর্কবার্তা মেনে চললেও অনেকে ঝুঁকি নিয়েই পানিতে নামছেন। নিরাপত্তার জন্য পর্যটকদের অন্তত হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতে তাদের কার্যক্রম মূলত তিনটি বিচের প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সীমাবদ্ধ।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, আগামী ৩দিন কক্সবাজারে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা রয়েছে। আর মঙ্গলবার (সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত) গত ২৪ ঘন্টায় কক্সবাজারে ৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি-দুইয়ের মিশেলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কক্সবাজার শহরবাসীর মাঝে। তবে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই বজ্রপাতে প্রাণ গেছে এক লবণ শ্রমিকের।