অস্বচ্ছল ও আইনী সুবিধা পেতে অর্সমথ নাগরিকদের সরকারি খরচে আইনী সহায়তা দেওয়ার সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দ্বোর গোড়ায় পৌঁছাতে সরকার কাজ করছে। যাতে আইনের সমান সুযোগ পাওয়ার প্রত্যেকের সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত হয়। এজন্য লিগ্যাল এইড এর কার্যক্রমের আরো ব্যাপ্তি ঘটাতে সরকার পূর্বের আইনগত সহয়তা প্রদান সংস্থাকে 'বাংলাদেশ আইনগত সহয়তা অধিদপ্তর' এ রূপান্তরিত করেছে। প্রবাসী, জুলাই যোদ্ধা, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে আহতদের লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনী সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম একথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, নিয়মিত আদালতে মামলা দায়ের করে মামলার দীর্ঘসুত্রিতার বিড়ম্বনা পোহানোর চেয়ে এডিআর এর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা অনেক শ্রেয়। মামলার মাধ্যমে কোন সমস্যার সমাধান হয়না, এডিআর এর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে সমস্যার সমাধান হয়। কথায় কথায় নিয়মিত আদালতে মামলা না করে এডিআর (অলটারনেটিভ ডিসপুট রেজুলেশন) এর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা অনেক উত্তম। তিনি আরো বলেন, লিগ্যাল এইড আইন দেশের সকল নাগরিকের বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছে।
জেলা চীফ লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম বলেন, আদালতে বিচারকদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যতো মামলা নিষ্পত্তি হয়, আবার একই সময়ে তার চেয়েও বেশি মামলা দায়ের হয়। তাই মামলা জট কমাতে লিগ্যাল এইড এর মাধ্যমে এডিআর পদ্ধতির গুরুত্ব খুব বেশি। সকলেই যাতে বিচার পায়, সেজন্য লিগ্যাল এইড এর সৃষ্টি। এজন্য লিগ্যাল এইডের সার্বিক কার্যক্রম আরো অধিকতর গতিশীল করতে হবে।
‘‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ" এই প্রতিপাদ্য নিয়ে কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনা সভায় কক্সবাজার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, কক্সবাজারের জেলা চীফ লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ অভিজিৎ চৌধুরী। আলোচনা সভায় অন্যান্যদের বক্তব্য রাখেন, কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মোহাম্মদ আবু হানিফ, কক্সবাজারের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: অহিদুর রহমান, পিপি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মন্নান, অ্যাডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, লিগ্যাল এইড এর প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ.বি.এম মহিউদ্দিন প্রমুখ। এসময় কক্সবাজার লিগ্যাল এইড অফিসের উপকারভোগী ক্লিনটন দে ও খুরশিদা বেগম তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভার শুরুতে কক্সবাজার লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম নিয়ে জেলা চীফ লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরীর তত্বাবধানে একটি চমৎকার ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।সভায় কোরআন তেলাওয়াত করেন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মোঃ আসিফ, গীতা পাঠ করেন বেঞ্চ সহকারী প্রণব কান্তি শর্মা ও ত্রিপিটক পাঠ করেন বেঞ্চ সহকারী সেতু বড়ুয়া। আলোচনা সভায় শ্রেষ্ঠ প্যানেল আইনজীবী যথাক্রমে পুরুষ ক্যাটাগীরতে অ্যাডভোকেট শাহা আলম ও মহিলা ক্যাটাগরীতে অ্যাডভোকেট এসমিকা সুলতানা'কে ক্রেষ্ট প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক রোকেয়া আক্তার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সিদ্দিক, ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ) কাজী সহিদুল ইসলাম, শিশু ধর্ষন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ) মো: রবিউল আলম, পারিবারিক আপীল আদালতে বিচারক (জেলা জজ) মামুনুর রশীদ, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ আদালতে বিচারক যথাক্রমে রশিদ আহমেদ মিলন, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সাইয়েদ মাহবুবুল ইসলাম, মো: আমিরুল হায়দার চৌধুরী, মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী ও মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) মোহাম্মদ আবদুল কাদের, সিনিয়র সিভিল জজ সাবরিনা চৌধুরী, সিনিয়র সিভিল জজ বেলাল উদ্দিন, সিনিয়র সিভিল জজ মো: রুহুল আমিন সহ জেলা বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারকবৃন্দ, জিপি অ্যাডভোকেট শামশুল হুদা, কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার, আইনজীবী, জেলার বিভিন্ন সরকারি দফতর ও সংস্থার প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, জাতীয় ও আন্তজার্তিক বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, বিশিষ্টজন, গণমাধ্যম কর্মী, লিগ্যাল এইড কমিটির সুবিধাভোগীরা অংশ নেন। দিবসটি উপলক্ষে পুরো কক্সবাজার শহর উৎসবমুখর হয়ে উঠে।
এর আগে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস পালন উপলক্ষে কক্সবাজার জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮ টায় কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে র্যালী ও দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম। এসময় অন্যান্যের মধ্যে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: আ: মান্নান, পুলিশ সুপার এ.এন.এম সাজেদুর রহমান প্রমুখ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও র্যালীতে অংশ নেন। উদ্বোধনের পর বাদ্যবাজনা, ঘোড়ার গাড়ি সহ বর্ণাঢ্য র্যালীটি কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়ক গুলো প্রদক্ষিণ করে। দিবসটি উপলক্ষে কক্সবাজার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সার্বিক কার্যক্রমের উপর গণমাধ্যমে নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়।
কক্সবাজারে দিবসের দিনব্যাপী পালিত অন্যান্য কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছায় রক্তদান, ফ্রী ব্লাড গ্রুপিং, ফ্রী মেডিকেল চিকিৎসা সেবা, ওজন পরিমাপ, ডায়াবেটিস পরীক্ষা, আইনী বইপত্র ও লিগ্যাল এইড সংক্রান্ত বইপত্রের স্টল, লিগ্যাল এইড মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কক্সবাজার জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী মেলা ও এসব অনুষ্ঠানমালা চলে।
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চৌকি আদালত এবং অন্যান্য উপজেলা সমুহেও বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় আইনগত সহয়তা দিবসটি পালন করা হয়।
এদিকে, জাতীয় আইনগত সহয়তা দিবসে কক্সবাজারে গৃহীত দিনব্যাপী কর্মসূচী সফল করতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করায় জেলা চীফ লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী কর্মসূচীতে অংশ নেওয়ায় আমন্ত্রিত অতিথি সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে লিগ্যাল এইড কমিটির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে আইনগত সহায়তা প্রদানকল্পে ২৮ এপ্রিলকে ২০১৩ সালে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।