গরুর গলায় লাল মালা, পায়ে ঘুঙুর আর মাথায় নানা সাজে কোরবানির গরু। আর তার সঙ্গে বাজছে বাদ্যযন্ত্র। চারদিকে কোরবানির গরু নিয়ে শিশু-কিশোর উল্লাস।
বুধবার (২৭ মে) বিকেলে কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়ক হলিডের মোড়ে দেখা গেল এমন দৃশ্য। তখন ঘড়িতে বিকেল সাড়ে চারটা। বাহারছড়ার সচেতন তরুণ সমাজ আয়োজন করে কোরবানির গরুর আনন্দ শোভাযাত্রা। এতে গয়না পরে হেঁটেছে বিভিন্ন রঙের ও আকারের গরু।
শতাধিক গরু একসঙ্গে সাজিয়ে কয়েক কিলোমিটার সড়ক প্রদক্ষিণ করে তৈরি করা হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাক-ঢোলের বাদ্য, মোটর শোভাযাত্রা আর অংশগ্রহণকারীদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
আয়োজকদের মতে, কোরবানির পশু প্রদর্শনের বাইরে এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করার একটি উদ্যোগ।
গরুর গলায় লাল মালা, পায়ে ঘুঙুর আর মাথায় নানা সাজে কোরবানির গরু। বুধবার (২৭ মে) বিকেলে শহরের প্রধান সড়কে একসঙ্গে শতাধিক গরুর এই শোভাযাত্রা ঘিরে যেন নেমে আসে উৎসবের আমেজ। লাল বাহাদুর, কালা চান, মেসি থেকে ট্রাম্প-সব নামের গরু এক কাতারে মিশে যায় আনন্দে। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস, গরুর পেছনে দৌড়ঝাঁপ আর রঙিন আয়োজন পুরো বাহারছড়া এলাকা করে তোলে প্রাণবন্ত।
বিকেলে বাহারছড়ার গোলচত্বরে শত শত শিশু, কিশোর ও তরুণ কোরবানির গরু নিয়ে জড়ো হন। নানা সাজে সাজানো গরু নিয়ে শুরু হয় প্রস্তুতি, পরে বিকেল সাড়ে ৪টায় বের হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার ফিরে আসে মাঠে। পুরো পথে ছিল বাদ্যযন্ত্র, মোটর শোভাযাত্রা ও অংশগ্রহণকারীদের উচ্ছ্বাস।
স্থানীয়রা বলছেন, এমন আয়োজন কেবল বিনোদনই নয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও এলাকার ঐতিহ্যকেও আরও দৃঢ় করে তুলছে।
ইমতিয়াজ নুর বলেন, ‘প্রত্যেক পরিবারের গরু তাদের নিজস্ব লোকজনই নিয়ন্ত্রণ করবেন। একটি গরুর সঙ্গে কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকবেন, তাই এখানে ঝুঁকির কোনো বিষয় নেই। এখানে বিভিন্ন উন্নত জাতের গরু রয়েছে-শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান-হলস্টেইনসহ নানা ভালো জাতের গরু রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় গরুর সংখ্যাও বেশি, যা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।’
আরেক অংশগ্রহণকারি আল আমিন বলেন, ‘এটি আমাদের একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বিগত দুই বছর ধরে আমরা এই আয়োজন নিয়মিতভাবে করে আসছি। মূল উদ্দেশ্য হলো এলাকাবাসীকে একত্রিত করা এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করা। আমরা চাই সবাই একসঙ্গে থেকে একটি সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলুক। এলাকাভিত্তিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করতেই প্রতিবছর এই আয়োজন করা হয়ে থাকে। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং আমাদের ভালোবাসা ও একতার প্রতীক।’
এদিকে আয়োজকরা বলছেন, এটি শুধু কোরবানির পশু প্রদর্শনের আয়োজন নয়; বরং এলাকার সামাজিক বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও শক্তিশালী করাই মূল উদ্দেশ্য।
আয়োজকদের একজন জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে সমাজের বিভিন্ন স্থানে দেখতে পাচ্ছি নানা ধরনের অপকর্ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের মাঝে ইতিবাচক চর্চা, সামাজিক বন্ধন ও মূল্যবোধের অনুশীলন অনেকটাই কমে গেছে। মানুষ ধীরে ধীরে ঐক্য ও সচেতনতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা সমাজের সকল মানুষের কাছে একটি সুন্দর বার্তা পৌঁছে দিতে চাই—আমরা যেন সব ধরনের অপকর্ম, অনৈতিকতা ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকি এবং একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা এবং মানুষের মাঝে ভালোবাসা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা।’
তিনি বলেন. ‘কোরবানি মানে শুধু আনন্দ নয়, কুরবানী মানে আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টা। সেই আত্মত্যাগের শিক্ষা আরও গভীরভাবে ধারণ করতে এবং মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করতেই আমরা প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন করে থাকি।’
আয়োজকদের আরেকজন সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পবিত্র হজের দিন ও আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানাই। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া, তিনি আমাদের কুরবানির তৌফিক দিয়েছেন। কোরবানি আমাদের ত্যাগ, তাকওয়া ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়—যার মূল বার্তা একতা, সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা।’
তিনি আরও বলেন, বাহারছড়াবাসী সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায় এবং সমাজের অনিয়ম, অশৃঙ্খলতা ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান গড়ে তুলতে চায়। আমাদের এই শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘বিজাতীয় অপসংস্কৃতির বিনাশ ও ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ।’ এটি কোনো প্রদর্শন নয়, বরং আমাদের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও ঐতিহ্যকে ধারণ করার একটি আন্তরিক প্রয়াস।
রশিদ আহমদ বলেন, ‘কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করা। আমরা সেই শিক্ষাকেই সমাজে ছড়িয়ে দিতে চাই, শুধু প্রচারণায় নয়—পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে।’
প্রশাসন, সহযোগী সকল ভাই ও এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় এই আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা বোঝার তৌফিক দান করুন।’
ব্যতিক্রমী এই কোরবানির গরুর আনন্দ শোভাযাত্রাকে ঘিরে পুরো বাহারছড়া এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। ভবিষ্যতেও এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।