ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে জাপানের পথে বাংলাদেশের দুই সার্ফার ফাতেমা আকতার ও মো. মান্নান। প্রথমবার এশিয়ান গেমসের সার্ফিংয়ে লড়বেন লাল-সবুজের এই দুই প্রতিনিধি। জাপানের বিশাল ঢেউ আর কঠিন কন্ডিশন সামলাতে কক্সবাজারে শেষ হয়েছে দু’সপ্তাহের নিবিড় প্রস্তুতি।
আর মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত ২টার দিকে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন দুই সার্ফার। এবার ফাতেমা ও মান্নানের লক্ষ্য একটাই-নিজেদের সেরাটা দিয়ে দেশের পতাকা উঁচুতে তোলা, আর গড়া নতুন ইতিহাস।
দুই সার্ফার জানান, কখন কোন ঢেউ নিতে হবে, কোনটি এড়িয়ে যেতে হবে-এসব কৌশলের পাশাপাশি বড় ঢেউ মোকাবিলার অনুশীলনও করেছেন তারা। জাপানের মতো কন্ডিশনে ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় অনুশীলনের পরিকল্পনা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। তাই কক্সবাজারের ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্টের ঢেউ ও আবহাওয়াকেই প্রস্তুতির মঞ্চ বানিয়েছেন তারা।
আগামী ২৫ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর জাপানে বসছে ২০তম এশিয়ান গেমস আইচি-নাগোয়া’র সার্ফিং প্রতিযোগিতা। অংশ নিচ্ছে এশিয়ার ১৭ দেশের ৪৮ জন সার্ফার। বাংলাদেশের হয়ে নারী বিভাগে ফাতেমা আর পুরুষ বিভাগে লড়বেন মান্নান। দেশের ইতিহাসে এশিয়ান গেমসের সার্ফিংয়ে এটাই প্রথম অংশগ্রহণ। জাপানের পথে পাড়ি দেওয়ার আগে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দুই সপ্তাহের ক্যাম্পে নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছেন তারা।
মান্নান ও ফাতেমার কোচ রাশেদ আলম বলেন, জাপানের মতো বড় ঢেউয়ের সঙ্গে অ্যাথলেটদের মানিয়ে নিতে ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় উন্নত কন্ডিশনে অনুশীলন করানোর পরিকল্পনা ছিল। সেটি সম্ভব না হলেও কক্সবাজারে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে গেছেন তারা। জাপান যাওয়ার আগে আজই শেষ অনুশীলন সেশন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিযোগিতায় কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে পারফর্ম করতে হবে, কখন কোন ঢেউ নিতে হবে আর কোনটি এড়িয়ে যেতে হবে-এসব বিষয়ে অ্যাথলেটদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানসিকভাবেও তারা প্রস্তুত।
রাশেদ আলম আরও বলেন, মান্নান ও ফাতেমা দুজনই কক্সবাজারের সন্তান এবং দীর্ঘদিনের অনুশীলনে তাদের পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো কন্ডিশনে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে-এমন আত্মবিশ্বাস রয়েছে। জাপানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে তারা ভালো পারফরম্যান্স করবে বলে আশাবাদী তিনি।
এদিকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর এবার স্বপ্ন পূরণের পালা ফাতেমা-মান্নানের। প্রতিকূলতা পেরিয়ে এশিয়ান গেমসে জায়গা করে নেওয়াকে নিজেদের ক্যারিয়ারের বড় অর্জন হিসেবেই দেখছেন তারা।
সার্ফার ফাতেমা আকতার বলেন, সার্ফিংয়ের যাত্রাটা আমার জন্য অনেক কষ্টের ছিল। অন্যান্য খেলার মতো সার্ফিং এখনও তেমন জনপ্রিয় নয়, অনেক মানুষ এই খেলাটি সম্পর্কে জানেনও না। সার্ফিং করতে গিয়ে অনেক বাধা পেরোতে হয়েছে, খারাপ সময়ও গেছে। সেসব বলে শেষ করার মতো নয়।
'তবে যখন শুনলাম আমি জাপানে গিয়ে এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তখন আগের সব কষ্ট ভুলে গেছি। বরং সার্ফিংয়ের প্রতি আমার আগ্রহ ও ভালোবাসা এখন আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেছে।'
ফাতেমা আকতার বলেন, 'জাপানে ভালো কিছু করার স্বপ্ন আছে। শুধু জাপান নয়, ভবিষ্যতে আমরা যেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরতে পারি-এটাই আমার স্বপ্ন। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ভালো করার চেষ্টা করব। এ জন্য সবার সহযোগিতা ও দোয়া চাই।'
সার্ফার মো. মান্নান বলেন, 'বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। প্রতিযোগী দেশগুলোর অ্যাথলেটরা অনেক ভালো মানের এবং তাদের নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এমনকি তারা প্রতি ছয় মাস পরপর দেশের বাইরে গিয়ে অনুশীলন করে।'
তাদের তুলনায় আমাদের প্রস্তুতিতে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও সেটিকে বাধা হিসেবে দেখছি না। বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। দেশের জন্য সম্মানজনক ফলাফল অর্জন করে বাংলাদেশকে আরও বড় পর্যায়ে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাপানে পৌঁছে আনুষ্ঠানিকতা শেষে নির্ধারিত ভেন্যুতে অনুশীলনের সুযোগ পাবেন দুই সার্ফার। ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় শুরু হবে মূল লড়াই। এরই মধ্যে এশিয়ান গেমসের অফিসিয়াল জার্সিও হাতে পেয়েছেন ফাতেমা ও মান্নান। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালুচরে করেছেন ফটোশুটও।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের টিম অফিশিয়াল (কোচ) মো. সাইফুল্ল্যাহ সিফাত বলেন, বুধবার জাপানে পৌঁছে রেজিস্ট্রেশন, অ্যাক্রেডিটেশন ও আবাসনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নির্ধারিত ভেন্যুতে যাবে দল।
তিনি বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা থেকে মূল সার্ফিং প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এর আগে ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ভেন্যু অনুশীলনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে অন্তত একদিন অনুশীলনের সুযোগ পাবেন বাংলাদেশের দুই অ্যাথলেট।
জাপানের মতো কন্ডিশনে আগে অনুশীলনের সুযোগ না হলেও নিজেদের অ্যাথলেটদের নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন। পুরুষ ও নারী বিভাগে জাতীয় চ্যাম্পিয়নদের মধ্য থেকেই দুই অ্যাথলেটকে নির্বাচন করা হয়েছে। পাশাপাশি মালদ্বীপ ও ভারতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাদের।
সিফাত বলেন, জাপানের সমুদ্র ও আবহাওয়ার কন্ডিশন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে ভিন্ন ভিন্ন ঢেউ ও আবহাওয়ায় দীর্ঘদিনের অনুশীলন রয়েছে অ্যাথলেটদের। তাই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঢেউ ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। কারণ, প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সার্ফিং দল অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে এশিয়ান গেমসেও এবারই প্রথমবারের মতো সার্ফিং অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে সমুদ্র ও আবহাওয়ার কন্ডিশন সবসময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ থাকবেই। তারপরও নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে ভালো ফল করার ব্যাপারে আশাবাদী তারা।
কক্সবাজারের এই ঢেউ থেকেই জাপানের বড় মঞ্চে পাড়ি দিচ্ছেন ফাতেমা ও মান্নান। প্রথমবারের এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে বাংলাদেশের নাম লেখানোর পর এবার তাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ-এশিয়ার সেরা সার্ফারদের সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া।
জাপানে অনুষ্ঠিতব্য ২০তম এশিয়ান গেমস আইচি-নাগোয়া’র সার্ফিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ছাড়াও অংশ নিচ্ছে আফগানিস্তান, চীন, চীনা তাইপেই, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, জাপান, লেবানন, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, সাউথ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডের সার্ফাররা।