মাঠে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ থাকা এবং নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হলেও সরকার নতুন করে এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের আওতায় কক্সবাজারের ৭৭টি মিল মালিকসহ মোট ২৩১টি প্রতিষ্ঠানকে লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাজার হাজার প্রান্তিক লবণচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আমদানির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৩১টি প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত (ক্রুড) লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৪২৯ মেট্রিক টন করে লবণ আমদানি করতে পারবে। অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী, ঋণপত্র (এলসি) খোলার সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে লবণ আমদানি সম্পন্ন করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আমদানিকৃত অপরিশোধিত লবণ পরিশোধন করে ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করতে হবে এবং সে বিষয়ে বিসিককে প্রমাণ দিতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিসিকের কক্সবাজার লবণ ইউনিটের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জাফর ইকবাল ভুঁইয়া দৈনিক কক্সবাজারকে জানান, গত মৌসুমে দেশে লবণের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন, অথচ উৎপাদন হয়েছে ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদনে ঘাটতি ছিল। চলতি মৌসুমে দেশের মোট লবণ চাহিদা ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায়, বিশেষ করে ঘন কুয়াশার কারণে অনেক এলাকায় লবণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও এখনও উৎপাদন শুরু হয়নি। গত মৌসুমের ঘাটতি এবং চলতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই সরকার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি জানান।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় লবণ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, ‘নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা নয়।’
তিনি আরও মন্তব্য করেন, দেশের বাজারের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে লবণের দাম বেশি হওয়ায় অনেক মিল মালিক বাস্তবে আমদানিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন।
এদিকে, বিসিক কক্সবাজারের সহকারী মহাব্যবস্থাপক রাসেল বড়ুয়া জানান, গত ৩০ ডিসেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় চাহিদা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় মহেশখালীর লবণচাষি ও ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এই মুহূর্তে লবণ আমদানির কোনো যৌক্তিকতা নেই। ইতোমধ্যে নতুন মৌসুমে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং মাঠে গত বছরের প্রচুর লবণ মজুদ রয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘মিল মালিকদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা চাষিরা এক কেজি লবণ উৎপাদন করে বিক্রি করছি মাত্র ৫ টাকায়, অথচ বাজার থেকে এক কেজি লবণ কিনতে হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন- চাষিদের সঙ্গে এত বৈষম্য কেন?’
অবিলম্বে আমদানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করা হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লবণচাষিরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
লবণচাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের সদস্য-সচিব মোহাম্মদ আতাউর রহমান জানান, গত মৌসুমে বাজারদর নিম্নমুখী থাকায় বিক্রি না হওয়া লাখ লাখ টন লবণ এখনও মাঠে মজুদ রয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে চাষ শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় লবণ আমদানি করা হলে চাষি ও ব্যবসায়ী পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়বে। তিনি দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুর বলেন, ‘এই মুহূর্তে লবণ আমদানি করা মানে লবণচাষিদের হত্যা করার শামিল। নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হয়ে যাওয়ার পর লবণ আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। লবণচাষিদের বাঁচানোর স্বার্থে সরকারের উচিত অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।’