বন্যার পানি নেমেছে, কিন্তু শুকায়নি কৃষকের চোখের জল। কক্সবাজারে ৪৩ হাজার কৃষকের কাছে এই বন্যা কেবল ফসল নয়, কেড়ে নিয়েছে জীবিকার ভরসাও। তাদের দাবি-ত্রাণ নয়, দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন। আর কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজ ও চারা সহায়তা দিয়ে দ্রুত চাষে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক বছরের স্বপ্ন ছিল ইসমাঈল মোহাম্মদের। ৪ কানি জমিতে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চাষ করেছিলেন তিন ধরনের শাকসবজি। কিন্তু কয়েক দিনের বন্যায় ভেসে গেছে সেই স্বপ্ন। পানি নেমেছে, তবে জমিজুড়ে এখন শুধু পচে যাওয়া ফসল আর লোকসানের দীর্ঘ হিসাব।
কক্সবাজারের চাঁন্দেরপাড়া এলাকার কৃষক ইসমাঈল মোহাম্মদ বলেন, “৪ কানি জমিতে পুঁইশাক, পাটশাক ও করলাসহ তিন ধরনের শাক-সবজি চাষ করেছিলাম। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। পুরো খেত বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি নামলেও জমির ওপর এক কোমর সমান কাদামাটি জমে আছে। এখন বুঝতে পারছি না-আগে কাদামাটি সরাব, নাকি নতুন করে চাষ শুরু করব। নতুন করে চাষের জন্য টাকা কোথায় পাব, কে দেবে? কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”
ইসমাঈলের মতো একই পরিণতি কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার হাজার হাজার কৃষকের। সবজির ভাণ্ডারখ্যাত রামু, চকরিয়া ও মাতামুহুরী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায়। নয় দিন পর পানি নেমেছে, কিন্তু মাঠজুড়ে এখন শুধু নষ্ট ফসল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছবি।
চকরিয়ার কৃষক আবছার উদ্দিন বলেন, টানা বৃষ্টিতে তার প্রায় ৩ লাখ টাকার বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মৎস্য ঘের থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। এতে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মাতামুহুরী এলাকার কৃষক রুহুল কাদের বলেন, বন্যার পানিতে তার বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘরে মজুত প্রায় ১০ মণ ধানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া শাক-সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এই ক্ষতির পর এখন তিনি চরম দুশ্চিন্তায় আছেন-কীভাবে ধার-দেনা পরিশোধ করবেন এবং কীভাবে সংসারের খরচ চালাবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, এখনও মাঠে কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা মেলেনি। তাদের দাবি-ত্রাণ নয়, দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন ও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে সরকারের কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ চান তারা।
রামুর মুক্তারকুল এলাকার কৃষক মফিজুর রহমান বলেন, “এখনো পর্যন্ত মাঠে আমরা কোনো কৃষি কর্মকর্তাকে দেখিনি। কৃষি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত মাঠে এসে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে বসা উচিত। কার কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। প্রান্তিক কৃষকদের এই সংকটে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।”
আরেক কৃষক ফরিদুল আলম বলেন, “আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, আমরা কৃষক। আমাদের ত্রাণের প্রয়োজন নেই; আমরা চাই দ্রুত আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। সরকার যদি বীজ, সার, কৃষিঋণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেয়, তাহলে আমরা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারব। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ভোগের মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য সরকারকে টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের বীজ-চারা সহায়তা দিয়ে দ্রুত পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, গত সাত থেকে আট দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। তবে গত দুই দিনে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমন ধানের বীজতলা, আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং কিছু পানের বরজ।
ড. প্রামানিক বলেন, প্রাথমিকভাবে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ ৮০ কোটিরও বেশি টাকা বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখনো আমন মৌসুমের সময় থাকায় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের দ্রুত নতুন করে বীজতলা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের আশ্বাস অনুযায়ী ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বীজতলা তৈরির জন্য বীজ সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি যেসব কৃষকের নিজস্বভাবে বীজতলা তৈরির সুযোগ নেই, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কমিউনিটি ভিত্তিক বীজতলা তৈরি করে সেখান থেকে চারা সরবরাহের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
ড. বিমল কুমার প্রামানিকের মতে, এবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কক্সবাজার জেলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।