পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। সাগরতীর জুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ, প্রাণ ফিরে পেয়েছে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য। পর্যটকদের নিরাপদ সমুদ্রস্নান ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সৈকতসহ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দায়িত্ব পালন করছে লাইফগার্ড সংস্থা ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।
বালিয়াড়ি পেরিয়ে কিটকটের দীর্ঘ সারি; তারপরই সাগরের নীল জলরাশি। একের পর এক ঢেউ এসে বিলীন হচ্ছে কূলে। তবে বিলীন হয় না ভ্রমণপিপাসুদের ঈদ আনন্দ। ঢেউয়ের মাঝে তারা খুঁজে নিচ্ছেন নোনাজলের প্রশান্তি।
সরজমিনে দেখা গেছে, সমুদ্রস্নানের পাশাপাশি টিউবে গা ভাসিয়ে আনন্দ উপভোগ করছেন অনেকে। কেউবা জেড স্কীতে চড়ে ছুটছেন গভীর সাগর। পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলো বন্দি করছেন মোবাইল কিংবা ক্যামেরায়। যেন ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা সব বয়সী মানুষ। চারদিকে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
ঢাকা মিরপুর ১৩ থেকে পরিবার ১০ সদস্য কে নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন ইফতিখার ও কানিজ দম্পতি। তাদের মেয়ে রুসাইফা ও ওয়াসিফা সুগন্ধা পয়েন্টে এসে চড়ছেন ঘোড়ার পিঠে। তারা বলেন, এই প্রথমবার ঘোড়া পিঠে চড়েছি। প্রথমে ভয়ের কারণে কান্না করি, কিন্তু পরে ঘোড়ায় চড়ার পর ভয়ে কেটে যায়।
মুন্সীগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা আল আমিন বলেন, কক্সবাজার সাগরপাড়ে এসে ঈদ উদযাপন অনেক আনন্দের। বেশ আনন্দ করছি বন্ধুদের নিয়ে। জেড স্কীতে চড়েছি, তার পাশাপাশি গোসল করছি নোনাজলে।
মোহাম্মদ সাব্বির নামে এক পর্যটক বলেন, এতো মানুষ, কিটকটে বসার সিট পাচ্ছি না। গরম থেকে বাঁচতে নোনাজলে গোসল করছি। পানি থেকে উঠতে মন চাই না।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী মাহে রমজানে প্রায় দেড় মাস পর্যটকশূন্য ছিল সমুদ্রসৈকত। এতে মন খারাপ ছিল সৈকত পাড়ের ব্যবসায়ীদের। তবে ঈদের টানা ছুটিতে পর্যটকদের আগমনে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক চালক, ঘোড়াওয়ালা ও বার্মিজ পণ্যের দোকানিদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
ঘোড়াওয়ালা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যবসা খুব ভালো হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে পর্যটক আসায় ২ ঘণ্টায় ২ হাজার টাকা আয় করেছি।
বিচ বাইক চালক মো. রাসেল বলেন, রমজানে আয় হয়নি, কারণ কক্সবাজারে পর্যটক ছিল না। এখন পর্যটককে ভরপুর, আয় বেড়েছে। খুব খুশি লাগছে
জেড স্কী ব্যবসায়ী মো. সাদ্দাম বলেন, গত দুই দিনের চেয়ে পর্যটক আজকে আরও বেড়েছে। পর্যটকরা সাগরতীরে আসছে, অনেকে জেড স্কীতে গভীর সাগর উপভোগ করছে। যার কারণে আমাদের আয় বেশ ভালো হচ্ছে।
এদিকে সাগরে ঢেউয়ের মাত্রা বাড়ায় সমুদ্রস্নানে ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই নির্দেশনা মেনে সমুদ্রে নামার পরামর্শ দিচ্ছেন লাইফ গার্ড কর্মীরা। আর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকত থেকে হোটেল-মোটেল জোনসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার ফিল্টিং ম্যানেজার মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রায় দেড় মাসের নীরবতা ভেঙে কক্সবাজারে আবারও পর্যটকের ঢল নেমেছে। বর্তমানে সৈকতে আনুমানিক লাখের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। তিনি জানান, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং আগামীকাল এই সংখ্যা আরও দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মাত্র ২৭ জন কর্মী দিয়ে কলাতলী, লাবণী ও সুগন্ধা-এই তিনটি সৈকতে সেবা দেয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি সাগরও কিছুটা উত্তাল রয়েছে। শীত মৌসুম শেষে ধীরে ধীরে বর্ষার পূর্বাভাস দেখা দিচ্ছে, ফলে সাগর আগের তুলনায় অশান্ত হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় সেবা দিতে গিয়ে কিছুটা হিমশিম খেতে হলেও লাইফগার্ডরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পর্যটকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই যদি লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলেন, তাহলে নিরাপদে সমুদ্রস্নান করা সম্ভব হবে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটেছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কলাতলী, লাবণী ও সুগন্ধা সমুদ্রসৈকতে স্থায়ী টিম দায়িত্ব পালন করছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি আরও বলেন, এর পাশাপাশি মোবাইল টিম পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে টহল দিচ্ছে। তারা ২৪ ঘণ্টা দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করে নিরাপত্তা জোরদার রাখছে। পর্যটকদের যেন কোনো ধরনের অসুবিধা না হয় এবং তারা নিরাপদে ভ্রমণ ও আনন্দ উপভোগ করতে পারেন-সে লক্ষ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পর্যটকদের হয়রানি রোধে সৈকতের তিনটি পয়েন্টে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চালু রয়েছে তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্র। অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।