ভোরের কয়েক মিনিটের ঝড়ো তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড দেশের বৃহত্তম শুটকি মহাল কক্সবাজারের নাজিরারটেক। উড়ে এবং পানিতে নষ্ট হয়েছে লাখ লাখ টাকার শুটকি, বিধ্বস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও শুটকি শুকানোর মাচা। ব্যবসায়ীদের দাবি, আকস্মিক টর্নেডোর আঘাতেই এই তাণ্ডব।
তবে আবহাওয়াবিদ বলছেন, টর্নেডো নয়-প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বর্ষণের কারণেও ঘটতে পারে এমন ক্ষয়ক্ষতি
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয় আকস্মিক তান্ডব। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বদলে যায় নাজিরারটেক শুটকি মহালের চিত্র। শুকাতে দেওয়া লাখ লাখ টাকার শুটকি উড়ে যায় চারদিকে। কোথাও ছিন্নভিন্ন মাচা, কোথাও বিধ্বস্ত পাকা স্থাপনা, ঘরবাড়ি ও শুটকির গুদাম। নেই ঘরের ছাউনি, ত্রিপল উড়ে গিলে ঝুলে আছে বৈদ্যুতিক তারে।
প্রত্যক্ষদর্শী মৎস্য শ্রমিক মনজুর আলম বলেন, “ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পর এদিক থেকে হঠাৎ একটা ঘূর্ণির মতো বাতাস শুরু হয়। বাতাসটি ঘুরতে ঘুরতে আমাদের ঘরের দিকে চলে আসে। তখন দেখি, বাঁশগাছসহ আশপাশের সবকিছু ঘুরছে। এ দৃশ্য দেখে আমি দ্রুত ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ি। ঘরে ঢোকার পর দেখি, আমার মাছ ধরার জালসহ অন্যান্য সামগ্রী সব উড়ে গেছে। সেগুলো সাগরের পাশে জোয়ারবাগানের ওই পাশের দিকে চলে যায়। কিছু সামগ্রী সাগরের পানিতেও পড়ে যায়।”
মৎস্য শ্রমিক নাজিম উদ্দিন বলেন, “বাতাস আসার সময় আমাদের ঘরের চালটি উপরে উঠে ঘুরতে ঘুরতে উড়ে যায়। তখন আমরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য বাঁশ ধরে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘরে থাকা মাছগুলোও বাতাস ও বৃষ্টিতে ভিজে যায়। কিছু মাছ উড়ে গেছে, আর যেগুলো থেকে গেছে সেগুলোও পুরোপুরি ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।”
শুঁটকি মহাল মালিক নাছির উদ্দিন বলেন, “প্রচণ্ড বাতাস ঘূর্ণির মতো ঘুরতে ঘুরতে সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা বাঁশগাছ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একপর্যায়ে আমার ঘরের চাল উড়ে গিয়ে আরেকটি ঘরের ওপর পড়ে। ঘরের ভেতরে শুকনা মাছ ছিল। এ সময় বৃষ্টিও হচ্ছিল। ফলে মাছগুলো ভিজে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। তখন আমাদের সামনে জীবন বাঁচাব, নাকি মাছ বাঁচাব-সেই চিন্তা করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। আমরা সবাই নিরাপদ স্থানে চলে যাই। পরে এসে দেখি, মাছগুলো ভিজে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের চাল উড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমার দুটি ঘরও ভেঙে গেছে।”
শুঁটকি মহাল মালিক মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, “আমার এখানে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে দুটি ঘর বানাচ্ছিলাম-একটি আমার, আরেকটি আমার বড় ভাইয়ের। ঘর দুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর মাত্র ১০-১৫ দিন হয়েছিল। এখনো পুরোপুরি ছাদ ঢালাই করা হয়নি, শুধু দেয়াল তোলা হয়েছিল। কিন্তু ভোরে হঠাৎ ঘূর্ণির মতো প্রচণ্ড বাতাস এসে ঘর দুটি ভেঙে দেয়। তখন সেখানে আমার কর্মচারীরা ছিলেন। তারা আমাকে জানায়, ঘর ভেঙে গেছে। ওই ঘরের মধ্যে প্রায় চার লাখ টাকার মাছ ছিল। ঝড়ের সময় মাছগুলোও উড়ে ছড়িয়ে পড়ে যায়। এখন এত বড় ক্ষতি হয়ে যাওয়ায় আমি কী বলব, বুঝতে পারছি না। সবই আল্লাহর ইচ্ছা।”
এদিকে মহাল মালিক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে এমন আকস্মিক তাণ্ডব খুব কমই দেখেছেন তারা। কয়েক মিনিটের ঝড়েই নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ শুটকি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক থেকে দেড় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে দাবি তাদের।
নাজিরারটেক মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, “টর্নেডোটি দুই থেকে পাঁচ মিনিটের মতো স্থায়ী ছিল। তখন আমি এখানে ছিলাম না। আমাদের কর্মচারীরা আমাকে ফোন করে “টর্নেডোর ভয়াবহতার কথা জানান। পরে এসে দেখি, প্রায় ১২ থেকে ১৪টি ঘর ভেঙে গেছে। এর মধ্যে পাকা স্থাপনারও ছিল। সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বাইরে রাখা আমাদের সব মাছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। পরে ব্যবসায়ীরা যার যার মাছ সংগ্রহ করে সেগুলো পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে আমাদের আনুমানিক এক থেকে দেড় কোটি টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।”
এদিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ এটিকে টর্নেডো বললেও, বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা আবহাওয়াবিদদের। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারি আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্যের কারণে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন মাত্রায় বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা ও সাগরে বাতাসের প্রবাহ বেশি থাকায় নৌযানগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
বিক্ষিপ্তভাবে দমকা বা ঝোড়ো বাতাস প্রবাহিত হওয়া এ সময়ে স্বাভাবিক। কোনো কোনো এলাকায় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে কোনো স্থানে এ ধরনের দমকা বাতাস আঘাত করলে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজারে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বেশি। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসে ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে পড়ে। অতিভারী বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি বাতাসের কারণে ওই এলাকায় মাটি দুর্বল হয়ে ধসের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে মাটির ভেতরে শূন্যতা তৈরি হওয়ায় কোনো কোনো স্থানে মাটি ধসে যেতে পারে।
এ ঘটনাটি টর্নেডো নয়। টর্নেডোর ক্ষেত্রে সাধারণত ঘূর্ণিবায়ুর স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ও ব্যাপক ঘূর্ণন দেখা যায়। বর্তমানে যে আবহাওয়াগত পরিস্থিতি রয়েছে, তা টর্নেডোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই আমরা বলতে পারি, অতিভারী বৃষ্টিপাত ও দমকা বাতাসের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান আরও বলেন, চলমান বৃষ্টিপাত আগামীকাল থেকে কিছুটা কমতে পারে। তবে এখনো বর্ষাকাল চলছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। চলতি মাসের ১৮ দিনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সামনে আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে বুধবার থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমে আসতে পারে।”
এদিকে কয়েক মিনিটের তান্ডবে নাজিরারটেকের শুটকি মহালে নেমে এসেছে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি। এখন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় এই মহালের ব্যবসায়ীরা।