গত মার্চ মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশে নামলেও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস কমেনি। পরিসংখ্যানের হিসেবে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অর্থনীতির ভাষায়, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হওয়া। কিন্তু বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র; দাম বাড়ার গতি কমা তো দূরের কথা, বরং বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে নতুন অস্থিরতা শুরু হয়েছে।
রবিবার ও সোমবার (২৬, ২৭ এপ্রিল) কক্সবাজারের কানাইয়া বাজার ও বাহারছড়া বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায় সবজি, মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনি ও মশলার দাম চড়া। ক্রেতারা বলছেন, আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি মেলাতে না পেরে তারা চাহিদার তুলনায় অনেক কম পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন আমিষ ও দামি সবজি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এ কারণে পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, 'দাম আরও বাড়তে পারে কিংবা সংকট দেখা দিতে পারে– এমন ভীতি থেকে ক্রেতারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছেন। একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম আরও বাড়িয়েছেন।'
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা:
ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার প্রবণতা ছিল। গতকাল রবিবার ( ২৭ এপ্রিল ) সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিনের লিটার বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা দরে। আর পাম অয়েলের লিটার বিক্রি হয়েছে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা দরে। এক মাস আগে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দর ছিল যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি।
এদিকে চিনির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। ঈদের আগে খোলা চিনির কেজি ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। এখন বেড়ে হয়েছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা। এলাকাভেদে দাম আরও বাড়তি।
বড় বাজারের কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, 'ছাড়া জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারে।'
আমিষে নাভিশ্বাস :
সাধারণ মানুষের আমিষের বড় উৎস ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারেও অস্থিরতা চলছে। সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা টাকায়।
রোজার মাঝামাঝি সময়ে দর ছিল ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। ঈদের সপ্তাহ খানেক আগে কিছুটা বেড়ে প্রতি কেজির দর ওঠে ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা। সেই হিসাবে মাস খানেকের ব্যবধানে দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা। এ ছাড়া ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় এবং লেয়ার মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা।
কানাইয়া বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী নুরুল হক দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'খাদ্যর দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে মুরগীর বাজারে। এছাড়া বিদ্যুৎ, গাড়ি ভাড়া, মজুরি ভাড়াও বেড়েছে। তিনি বলেন, যারা মুরগীর খাবার ও বাচ্চা উৎপাদন করেন তাঁদের কারনে আজ বাজারের এই পরিস্থিতি। তাঁদের সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে না পারলে দাম আরও বাড়বে।'
কারণ ছাড়া বেড়েছে গরুর মাংসের দাম :
বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে হাড় ছাড়া ১০০০ টাকা এবং হাড়সহ ৮৫০ টাকা। মহিষের মাংস বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি হাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা।
বাহারছড়া বাজারের ব্যবসায়ী আবু বাহাদুর দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'খামার ও বাজারে পশুর দাম চড়া এবং উদাহরণ খরচ বৃষ্টি। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। হাড়সহ ৮০০ টাকা নিচে বিক্রি করলে লোকসানে পড়তে হবে।'
অস্থির মাছের বাজার :
খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি মাছের বাজারে। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে -এমন মাছ রুই, কাতলা, তেলাপিয়ার দামও অনেক বাড়তি।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে পাঙ্গাশ মাছ ২২০-২৫০ টাকায়। কই (চাষের) ৩৫০-৪০০ টাকা, রুই ৩৪০-৩৬০ টাকা, মৃগেল ৩৫০ টাকা, কার্প ৪০০ টাকা, মিঠা পানির কোরাল ৮০০-১২০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০-৩০০ টাকা, ট্যাংড়া ৬০০-৭০০ টাকা। সাগরের সুরমা ৭০০- ৮০০ টাকা, তাইল্যা ৭০০-৯০০ টাকা, বাটা ৫০০-৬০০ টাকা, সাগরের কোরাল ১০০০-১৩০০ টাকা, রুপচাঁদা ১২০০-১৪০০ টাকা, ফইল্যা ১৩০০-১৪০০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮০০-১০০০ টাকা, ছোট চিংড়ি ৭০০-৮০০ টাকা, ঘুইজ্যা আকারভেদে ৫০০-৮০০ টাকা, পাঁচমিশালী ২৫০-৩০০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, 'সাগরে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছের দাম বাড়তি। এছাড়া, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাছ পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মাছ পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন খরচ বাড়লে সরাসরি খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ে। চাষের মাছের ক্ষেত্রে, মাছের খাবারের (ফিড) দাম, বিদ্যুৎ বিল এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।'
উত্তাপ সবজির বাজার :
গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সবজির বাজার। ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বেড়ে বেশ কয়েকটি সবজির কেজি শতক ছাড়িয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে বাজারে। কিন্তু দাম বাড়তি।
সবজির বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে নতুন কাঁকরোল ১০০-১২০ টাকা, এ সপ্তাহে আগে দাম ছিল ১৬০ টাকা।।
কচুরলতি ৮০ টাকা, শসা বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকায়, টমেটো ৩০-৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, লাউ ৩ প্রতি পিস ৫০ টাকা ,মিষ্টি কুমড়া কেজি ৪০-৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৮০-১০০ টাকা, কাঁচামরিচ ১০০-১২০ টাকা, গাজর ৫০-৬০ টাকা, দেশি আলু ৫০-৬০ টাকা, বগুড়ার আলু ৪০ টাকা, ললিতা আলু ২৫ টাকা, শিম বরবটি ৮০ টাকা, পটল ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যাবসায়ীরা। অন্যদিকে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। বাজারে পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকা, রসুন ১৬০ টাকা এবং আদা ২৬০-২৮০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দরে মিলছে না এলপিজি:
নিত্যপণ্যের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের দামও চড়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ বাংলাদেশে এলপিজির দাম দুই দফায় বেড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১,৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ১৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ২ এপ্রিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারিণ করেছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
খুচরা বিক্রেতারা দুই হাজার থেকে ২১০০ টাকা এবং এলাকাভেদে এর বেশি দামেও গ্যাস বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাহারছড়া বাজার এলাকার ব্যবসায়ী শফিউল আলম জানান, 'সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। দোকানে তালিকা আছে, সেই তালিকার দাম অনুযায়ী গ্যাস বিক্রি হচ্ছে।'
সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার পরামর্শ :
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'যুদ্ধ শেষ হয়েছে কিন্তু ব্যবসায়ীদের অজুহাত শেষ হচ্ছে না। তারা জ্বালানি সংকট দেখিয়ে মানুষের পকেট কাটছেন। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চেয়েও বেশি বেড়েছে। অথচ সরকার বলছে, সবকিছু স্বাভাবিক। আগের সরকারগুলোও বলত– সব ঠিক আছে।'
তিনি বলেন, 'ব্যবসায়ীদের সুরে এ ধরনের বক্তব্যে মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা ফ্রি স্টাইলে দাম বাড়িয়ে ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে যেন জিম্মি করতে না পারে, সে জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে।'
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল জানান, সেখানে তিনি কৃষি কাজ করতেন। ২০২২ সালে কক্সবাজার চলে আসেন। শহরে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং অনেক সময় ১০০ টাকা আয় করেন। এর মধ্য থেকে রিকশার মালিককে টাকা দিতে হয় ২৫০-৩০০ টাকা।
জয়নাল বলেন, 'প্রতিদিন তো আর রিকশা চালাতে পারিনা। এভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।'
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অধিদপ্তর এখন ভোজ্যতেল আর এলপিজি গ্যাসের বাজারের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। অন্য নিত্যপণ্যের বাজারেও তদারকির চেষ্টা চলছে। তবে ভোক্তা অধিদপ্তরের একার পক্ষে এত বড় কাজ করা কঠিন।
জেলা ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি হচ্ছে মূখ্য বিষয়; জ্বালানি তেল দাম বৃদ্ধি অথবা সংকট তৈরি হলে পণ্যের দাম বাড়বে, এটাই ূস্বাভাবিক। তিনি বলেন, গত ১ সপ্তাহে ৪টি অভিযান হয়েছে। যেখানে জরিমানা করা হয়েছে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নকল মোড়কে দেশীয় কোম্পানির বোতলে করে ভোজ্যতেল বাজারে বিক্রি করছে, একটি অসাধু চক্র। তাঁদের অবস্থান ও চিহ্নিত করতে কাজ চলছে। কারণ, এটা সম্পূর্ণ অবৈধ। এর আগেও বাহারছড়া বাজারে নকল ভেজ্যতেল (রোহিঙ্গা ক্যাম্পের) বিক্রি অভিযোগে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছি। তিনি বলেন, দাম নির্ধারণ করার আইন আমার নেই, দাম কেন বাড়ছে, কি কারনে বাড়ছে, এগুলোর জন্য আলাদা দপ্তর আছে; তারা এসব নিয়ে তদারকি করবেন। আমার কাজ খাদ্যর মান ও ভেজাল নিয়ে কাজ করা।'