খালেদা বেগম জ্যোৎস্না
নীচে গেটে বেশ হইচই, কি ঘটনা দেখতে গিয়ে চক্ষুচড়ক গাছ! আমার ফ্রকপরা জীবনের পাঁচ ছয় জন বান্ধবী (যারা এখন দাদী, নানি হয়েছি) হৈ হৈ করে বাসায় ঢুকছে। তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে ওদের স্বাগত জানালাম। কেউ সোস্যাল মিডিয়ার চৌদ্দ গুস্টি উদ্দার করছে, কেউ ছেলে মেয়েদের ধোলাই করছে, কেউ আবার নিজের কপাল চাপড়াচ্ছে। এদিকে আমার অবস্থা বেগতিক, কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না। কোন রকমে শান্ত করলাম তাদের, এর মধ্যে ঠান্ডা পানির শরবত সবার হাতে ধরিয়ে, জানতে চাইলাম বিষয়টা কি? কার আগে কে বলবে তা নিয়ে মিস্টি মধুর ঝগড়া হলো প্রায় তিরিশ মিনিট, সবাইকে থামিয়ে দিয়ে হাই কোর্টের উকিল মহোদয়া আমার কাছে জানতে চাইলো “তুই কিছু বলবি”? আমি হতবাক! পরে অবশ্য বুঝতে পারলো আমি তো ওদের আলোচনায় ছিলাম না। এটা বলা আবশ্যক যারা এসেছেন, এদের কেউ শিক্ষিকা, কেউ প্রভাষক, কেউ হাই কোর্টের ডাকসাঁইটে উকিল, দু’একজন আবার যৌথ পরিবারের কর্ণধার অর্থাৎ সবাই ব্যস্ত, এর মধ্যে উঠে স্কুল শিক্ষিকা জানতে চাইলো খবরের কাগজ, সোস্যাল মিডিয়াতে মা দিবস বা মা সর্ম্পকে লিখা গুলো আমি পড়েছি কি না? আমি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লাম। এবার সবাই নড়েচড়ে বসলো। সবাই একসাথে বলে উঠলো, মা’দের প্রতি এতো ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তা হলে অমুকের এ অবস্থা, তমুকের সে অবস্থা কেন? সম্প্রতি এই যে এত বৃস্টি, ঝড়, বন্যা গেল, কতজন মা বাবার যত্ন সঠিক ভাবে নিয়েছে? আসলে একটা সময়ে মা’রা এসব বিযয় দেখতে দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু বন্ধুরা যেভাবে সিরিয়াস হয়ে ভাবছে নিজে কখনও সেভাবে ভাবিনি। কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম আমরা কি করতে পারি?
বলা মাত্র দু একজন আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো, মনে হয় আমাকে জুতা পিটা দিবে! অবস্থা বেগতিক দেখে বিনয়ের সাথে জানতে চাইলাম আমরা কি করতে পারি? সবাই মিলে প্রস্তাব করলো, চল আমরা একটা সার্ভে করি। সার্ভে! আমি জানতে চাইলাম কেউ আগে করেছে কি না? মহোদয়ারা জানালো কেউ কলেজে, কেউ স্কুলে, কেউ ক্লায়েন্টদের নিয়ে করেছে, খোঁচা দিতে ছাড়লো না, বলে তুইতো এনজিও তে কাজ করেছিস, তোর তো জানার কথা! স্বীকার করলাম সার্ভের উপর ট্রেনিং নিয়েছি, দিয়েছিও। তবে এর তো কিছু ফর্মূলা আছে, দু একটা জানালাম, যেমন কাদের নিয়ে করবো, কতজন অংশগ্রহণকারী থাকবে, কোন বয়সের, নারী-পুরুয অংশগ্রহণকারীর অনুপাত, প্রশ্নপত্রের ধরণ, ফিল্ড টেস্ট, কারা সম্পাদন করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাই একবাক্যে একমত! স্কুলের নাম ধরে প্রভাষক বন্ধু মতামত দিলো (বলা যাবে না আমার একটা নাম ছিলো বান্ধবীদের দেওয়া) দেখ, আমরা তো এটা নিয়ে কোন ফান্ড আনবো না কিংবা কোন প্রকাশনাও করবো না, উদ্দেশ্য আমাদের আসে পাশে যারা আছেন তাদের সত্যিকারের কথাটা জানা। এটার জন্য তোর এনজিও মার্কা ফর্মূলার দরকার নেই। আমরা কাজটা করবো নিজেদের জন্য, নিজেদের চারপাশে মা দের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। একজন তো মুখ ভেংচিয়ে বলল, আমরা হেন তেন, দিন কে রাত করে কোন ডোনারের কাছে যাব না, তুই সাথে আছিস কি না বল। এক একজনের কথা যেন মিসাইল, আমার অবস্থা (পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে)! এর মধ্যে উকিল মহোদয়া জেরা শুরু করলেন কে কে মা দিবস সর্ম্পকে কি জানে? ও মা! দেখি যৌথ পরিবারের কর্তা দু’জন কখন কিভাবে মা দিবস শুরু হয়েছে, কবে থেকে আমাদের দেশে শুরু, আর একজন তো কোন দেশে মা কে কি নামে ডাকে তার ফিরিস্তি দেওয়া শুরু করেছে। আর তাদের আলোচনার ধরণ দেখে নিজেকে বোকা ছাড়া, অন্য কিছু ভাবতে পারলাম না। যাই হোক, আসল কথায় আসার চেষ্টা করলাম। সার্ভে করার টাকা, জনবল, তাদের ট্রেনিং, কত জন হবে, কোন বয়সের, নারী-পুরুষ অনুপাত, স্থান এসব কি হবে। তখন শিক্ষিকা মহোদয়া একটা প্রিন্ট করা কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে রইলো। দেখলাম ওরা কোমর বেঁধে নেমেছে।
প্রশ্ন পত্রটা হাতে নিয়ে আমি হতবাক! লা জবাব! ওদের অনুরোধ করলাম একটু সময় দেওয়ার জন্য। লিডার উকিল মহোদয়া সদয়ভাবে সময় বেঁধে দিয়ে জানালো, আগামী সপ্তাহেই সার্ভে শুরু করতে চায়। আমরা আবার পরশু একসাথে বসবো, তুই তৈরী থাকিস। এযেন সেনাপতির আদেশ।
প্রশ্নপত্র নিয়ে একমত হলো: ২ টি প্রশ্নপত্র, একটি মা ছাড়া সবার জন্য আর একটি শুধু মা’দের জন্য। তাছাড়া হ্যাঁ এবং না এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ভালো, তবে কেই যদি কিছু বলতে চান, তা লিখে রাখবে। এলাকা ঠিক করা হলো শহরের মধ্যে। এ ছাড়া ছোটখাট অনেক বিষয়ে আলোচনা করার পর। যা আমরা পেয়েছি তা একটু আপনাদের সাথেও শেয়ার করি! এর আগে আমরা নিজেদের বাস্তব জীবনের সাথে প্রশ্ন গুলো মিলিয়ে নিলাম। শুকরিয়া আমারা সবাই ভাল অবস্তানে আছি, নতুবা এ সার্ভে অসম্পূর্ণ হবে।
আমরা যা পেয়েছি তা হলো:
মধ্যম আয়ের অংশগ্রহন কারীগণ:
মধ্যম আয়ের অংশগ্রহন কারীগণ:
বিবাহিত পুরুষ:
৭০% সাথে মা, বাবা থাকেন , ১০% দেশের বাড়ীতে, ১৫% শুধু মা (যাদের স্বামী নেই) মেয়ের সাথে, ৫% অন্য ভাইদের সাথে। আবার ৩০% এর সাথে শ্বাশুড়ি সাথে শালা ,শালী থাকেন।
যাদের সাথে মা থাকেন না, তারা মা’ কে ঈদে/পূজাঁ/ অন্য কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দেখতে যান। কারণ হিসেবে জানান মা’তো ওখানে ভালো আছে/ভিড্ওি কলে কথা হয়। কাজের জন্য যাওয়ার সময় হয়ে উঠে না।
৮০% মনে করে মা’ অন্য ভাই বোনদের বেশি পছন্দ করে। আক্ষেপ করে জানান এতো কিছু কর্ওে মা অন্যদের বেশি পছন্দ করে। টাকা তো দেখি বোন আসলেই বের করে।
মা’য়ের জন্য কি করেছেন, তা জানতে চাইলে থাকা খ্ওায়া ছাড়া তেমন কিছু উল্লেখ করতে পারেন নি।
৮৫% জানেন না মা’র পছন্দের খাবার কি?
৯৭% জানিয়েছেন কোন সময় শুধু মাত্র মা’কে নিয়ে বেড়াতে যাননি।
১০০% জানিয়েছেন শুধু মাত্র মা’য়ের জন্য আলাদা করে কিছু আনেন নি/প্রয়োজন মনে করেনি।
৮০% জানিয়েছেন মা’কে হাত খরছের টাকা দেন না/প্রয়োজন মনে করেন না। বিষয়টা উনাদের অবাক করেছে।
৮৬% জানেন না মা কি ঔষুধ খান।
১০০% জানান মা’য়ের হাতের রান্না অতুলনীয়।
৯৫% জানান এই বৃস্টি, বন্যার সময়, আলাদা ভাবে মায়ের কথা ভাবেননি।
৯০% জানান মা’কে নিয়ে ফেসবুকে লিখেন!
মধ্যম আয়ের অংশগ্রহন কারীগণ:
বিবাহিতা নারী:
৯৬% মা, বাবাকে সংসারে রাখলে অহেতুক অশান্তি হবে।
৮৫% নিয়মিত মা বাবা/মা কে দেখতে যান।
৬৭% মনে করে মা’ অন্য ভাই বোনদের বেশি পছন্দ করে।
মা’য়ের জন্য কি করেছেন ,তা জানতে চাইলে, ৮৫% জানান এটার দরকার নাই।
৮৫% জানেন না মা’র পছন্দের খাবার কি?
৭৭% জানিয়েছেন কোন সময় শুধু মাত্র মা’কে নিয়ে বেড়াতে যাননি।
৪৫% জানিয়েছেন শুধু মাত্র মা’য়ের জন্য আলাদা করে কিছু আনেন নি।
৭৪% জানেন মা কি ঔষুধ খান।
১০০% জানান এই বৃস্টি, বন্যার সময়, আলাদা ভাবে মায়ের কথা ভাবেছেন।
৯০% জানান মা’কে নিয়ে ফেসবুকে লিখেন না।
স্বল্প আয়ের ( রিকশা চালক, দিন মজুর,মুদির দোকানদার, ভ্যান চালক) অংশগ্রহন কারীগণ:
বিবাহিত পুরুষের
৯০% সাথে মা,বাবা থাকেন , ১০% দেশের বাড়ীতে।
যাদের সাথে মা/মা,বাবা থাকেন না তারা প্রতি সপ্তাহে বা ১৫দিন পর মা/মা,বাবাকে দেখতে যান।
৮৮% মনে করে মা/মা,বাবা উনাকেই বেশি পছন্দ করেন।
মা’য়ের জন্য কি করেছেন ,তা জানতে চাইলে,জানান আমার প্রাণ জুড়ে আমার মা।
৮০% জানেন মা’র পছন্দের খাবার বাকি ২০% জানান সামর্থ্য কুলায় না পারেন না।
৯৪% জানিয়েছেন শুধু মাত্র মা’কে নিয়ে বেড়াতে যান। রিকশা করে চাদঁনি রাতে মা ঘুরতে পছন্দ করে।
৭৮% জানিয়েছেন শুধু মাত্র মা’য়ের জন্য আলাদা করে কিছু আনেন , অনেকেই হেসে জানান কোন হা----কি কইলো তাতে আমার কি আসে যায়।
১০০% জানিয়েছেন সারা দিনের আয়ের টাকা মা’য়ের হাতে দেন, সংসারের কর্তা যত দিন মা বেচেঁ থাকবেন ততদিন আর কেউ না।
১০০% জানান না মা কি ঔষুধ খান তা বাসায় আসার সময় নিয়ে আসেন।তবে কি ঔষুধ তা পড়তে পারেন না।
১০০% জানান মা’য়ের হাতের রান্না অতুলনীয়।
৯৫% জানান এই বৃস্টি,বন্যার সময় , আলাদা ভাবে মায়ের যত্ন নিয়েছেন।
কেউ মা’কে নিয়ে ফেসবুকে লিখেন না।
অবিবাহিত নারী পুরুষের:
৯০% সাথে মা,বাবার সাথে থাকেন ।
৮৮% মনে করে মা’ ওকেই বেশি পছন্দ করেন।
৭৬% জানান মা’র সাথে খান ,আলাদা ভাবে খাবার এ বিষয় টা ভেবে দেখে নি।
৮৫% জানান এই বৃস্টি,বন্যার সময় , আলাদা ভাবে মায়ের কথা ভেবেছেন।
৯০% মেয়েরা জানান তারা মা’য়ের সাথে বেড়ান, ৪০% ছেলেরা কোন সময় শুধু মাত্র মা’কে নিয়ে বেড়াতে যাননি।
৭০% জানিয়েছেন শুধু মাত্র মা’য়ের জন্য আলাদা করে কিছু আনেন, যখন টাকা হাতে আসে।
৯৫% জানেন মা কি ঔষুধ খান
৯৬% জানান মা’কে নিয়ে ফেসবুকে লিখেন!
মা’দের কাছ থেকে জানা:
৭৮% মা যাদের স্বামী আছে তারা তুলনামুলক ভাল অবস্থানে আছেন। যেমন. বেড়ানো, খ্ওায়া, চিকিৎসা এসব বিষয় স্বামীই দেখেন।
৮৭% মা আয় করা সন্তানের মুখাপেক্ষি থাকেন, প্রায় সব বিষয়ে। বিষয় গুলো বলতে সংকোচ বোধ করেন।
৮৭% মা কখন শেষ বেড়াতে গেছেন মনে করতে পারেন নি ।
৭৪% মা পছন্দের খাবারের কথা ভুলে গেছেন, কারণ কেউ পাত্তা দেয় না।
৮৫% মা জানান নিজের কতৃত্ব যেখানে নেই ,সেখানে পর পর মনে হয়।কেউ কেউ জানান স্বামীর ভাত খা্ও রাণীর মতো, ছেলের ভাত মেহমানের মতো আর মেয়ের ----বলতে চাননি।
৯২% মা জানান ছেলে মেয়েদের ঝগড়া পছন্দ করেন না, যা উনার নিজের জমি, টাকা আর অলংকার নিয়ে করে।
ঔষুধ/ডাক্তারের কাছে য্ওায়া এসব অবিবাহিত ছেলে মেয়েরা করে, যাদের অবিবাহিত ছেলে মেয়ে নেই ,সে ক্ষেত্রে ছেলের বউ বা প্রতিবেশীদের সাহায্য নেন। এখানে % করা কঠিন । তবে চিত্রটা প্ওায়া গেছে।
উক্তি: বিবাহিত পুরুষের
আমার মা’য়ের মাথাটা খারাপ করেন না। উনি ভালো আছেন, আপনাদের মাথাব্যথা আপনাদের কাছেই রাখুন।
বিবাহিতা নারী:
আমার মা আমাদের জন্য যা করেছেন, আমরা তা করতে পারছি না। সংসার সামলাতেই হিমসিম খাই।তবে মাঝে মাঝে ভাবি মা’য়ের কথা।
অবিবাহিত নারী পুরুষের:
বিষয়টা ইন্টারেস্টিং, যা আগে ভাবি নি।
একজন মা’র উক্তি:
সন্তান বড় হলে মা’ কে বোবা হয়ে যেতে হয়।এখন তো ছেলে মেয়েদের আপণ মানুষের অভাব নাই!
কি বুঝলেন? এটাই যদি সামন্য চিত্র হয়ে থাকে,ফেসবুকে এত মাতামাতি মা দিবস /মাকে নিয়ে তা কি ফেইক! না লোক দেখানো! আমার জানা কিছু বন্ধু মা’ কে নিজের কাছে রাখে নাতি,নাতনিদের দেখাশুনা করার জন্য, কি অবাক কান্ড যেখানে মা’কে দেখবে! সেখানে তার সন্তানদের দেখাশুনা করা, বয়সের বিষয়টা কি মনে নেই!আবার কেউ বোনের কাছে রাখেন, নিজেদের ফ্লাটে জায়গা কম!নচিকেতার গানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সব সন্তানের প্রতি মা বাবাকে ভালোবাসুন, যতটুকু পারেন উনারা বেঁচে থাকতে করেন। মরে গেলে মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে’ এসব গেয়ে, লোক দেখানো মেঝবান করার দরকার আছে কি?
সব মা’দের বলি সন্তান বড় হলে তা কে বুঝার চেস্টা করেন। তার মতামতের মুল্য দিন।
মেকি কোন সর্ম্পক মা বাবা এবং সন্তানের মাঝে থাকা দরকার নেই। দিবস পালনে কিছু যায় আসে না। নিজের মা বাবা নিজেরই, আর সন্তান সে তো নাঁড়ি ছেড়া ধন।