সমুদ্র শহর কক্সবাজারে প্রতি বছর লাখো পর্যটকের আগমন ঘটে। পর্যটনের রাজধানী বলা হলেও এ জেলায় এখনো বিদেশিদের জন্য আলাদা কোনো জোন গড়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে এ জেলার মাদক ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের কারণে নেতিবাচক আলোচনাও কম নয়।
দেশের সর্বদক্ষিণের এই জেলাটি শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে। নেই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত। ২৮ লাখের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ থাকা সত্ত্বেও রয়েছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবারও ঘাটতি।
সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও অতিরিক্ত চাপ ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। ফলে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জেলার মানুষ মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।
এমন প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর শনিবার (১৩ জুন) প্রথমবারের মতো কক্সবাজার জেলা সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে তিনি সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনসহ একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। এটি তার ষষ্ঠ কক্সবাজার সফর।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে কক্সবাজারবাসীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, কক্সবাজারের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিবেচনায় তিনি বিশেষ কোনো ঘোষণা দেবেন। ইতোমধ্যে একগুচ্ছ দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
যা চায় কক্সবাজারের মানুষে
এদিকে শুক্রবার (১২ জুন) কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, কক্সবাজারবাসীর পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তিগত বা স্থানীয় দাবি উত্থাপন করা হবে না। তবে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে।
দাবির মধ্যে রয়েছে-লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা এবং কক্সবাজারে ব্লু ইকোনমি ও মেরিন সায়েন্সভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কক্সবাজার সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা, কক্সবাজার সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, কক্সবাজার-মহেশখালী সেতু নির্মাণ, পিএমখালীর পাতলী খালকে শহীদ জিয়া স্মৃতি খাল নামকরণ এবং কক্সবাজার স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আকতার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জমি দান এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রচেষ্টায় ১৯৯৩ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নানা সীমাবদ্ধতা ও অবহেলা পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে কলেজটি জাতীয়করণ হলে কক্সবাজারের উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মীর মোশারফ হোসেন টিটু বলেন, কক্সবাজারকে দেশের পর্যটন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পর্যটন খাতে আরও আধুনিক ও পরিকল্পিত উন্নয়নে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও নারী নেত্রী নাছিমা বকুল বলেন, কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও সীমান্তকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধের কারণে স্থানীয়দের উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সরকারের আরও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুআক)-এর সাধারণ সম্পাদক মো. আকতার নুর বলেন, কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা এবং সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল দাবি।
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ বলেন, কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন শহরে রূপান্তর এবং পান, লবণ ও মৎস্য শিল্পের আধুনিকায়ন সময়ের দাবি।
মহেশখালীর তরুণ বিএনপি নেতা আ স ম জাহেদুল হক নাহিদ বলেন, মহেশখালীর লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন হলো মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটি সেতু। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজারের মাটি থেকে মহেশখালীবাসীর এই ন্যায্য দাবি পূরণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবেন।
যেসব কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার (১৩ জুন) সকাল ৯টায় সপরিবারে বিমানযোগে কক্সবাজার পৌঁছাবেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত পাতলী-মাছুয়াখালী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন এবং সেখানে সংক্ষিপ্ত পথসভায় বক্তব্য দেবেন।
পরে সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে তিনি সড়কপথে চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের উদ্দেশে রওনা দেবেন। দুপুর ১২টায় সাফারি পার্কে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ‘সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’র শুভ উদ্বোধন করবেন এবং পার্ক পরিদর্শন করবেন।
সূচি অনুযায়ী, দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে তিনি পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা মুরাপাড়ার উদ্দেশে রওনা দেবেন। দুপুর ১টায় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রথম শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করবেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
দুপুর দেড়টায় সেখান থেকে রওনা দিয়ে তিনি দুপুর ২টায় নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। পরে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও মোনাজাতে অংশ নেবেন। জোহরের নামাজ আদায়ের পর বিকেল ৩টায় পেকুয়ার সাঈদ ম্যানশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন।
বিকেল সাড়ে ৩টায় তিনি পেকুয়া থেকে রওনা হয়ে বিকেল ৪টায় চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালে পৌঁছাবেন। সেখানে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন।
জনসভা শেষে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে তিনি কক্সবাজার শহরের উদ্দেশে রওনা দেবেন। বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও মেরিন ড্রাইভ এলাকা পরিদর্শন করবেন।
একই দিন রাত ৮টায় কক্সবাজারের লং বিচ হোটেল অডিটোরিয়ামে জেলার বিশিষ্ট নাগরিক ও সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন। সভা শেষে রাত ৯টায় সপরিবারে বিমানযোগে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন।
কক্সবাজারে ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
এদিকে শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে কক্সবাজারে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ছয়জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।
তাঁরা হলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
এদিন তাঁরা কক্সবাজার পৌঁছে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির স্থানগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন। শুক্রবার বিকেলে চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালের জনসভাস্থল পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
অপরদিকে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি দুপুরে কক্সবাজার সদরের পিএমখালী এবং শহরের লং বিচ হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর সভাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তায় ৩ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান জানান, পুরো কক্সবাজারে ৩ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সাদা পোশাকে এপিবিএন, এসবি ও ডিএসবির সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। সফরস্থলগুলো আগেভাগে পরিদর্শন করে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পুরো কক্সবাজারকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ে আনা হয়েছে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সফলভাবে সম্পন্ন হবে।