কক্সবাজার জেলা খেলোয়াড় সমিতি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টের ফাইনাল ঘিরে কক্সবাজারের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে দর্শকের ঢল। ধারণক্ষমতার বেশি দর্শকে গ্যালারি পূর্ণ, বাইরে অপেক্ষায় আরও হাজারো মানুষ। তৈরি হয় ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা। এক বছর আগের ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের স্মৃতি থাকায় ছিল নিরাপত্তা শঙ্কাও। তবে দর্শকের এই উন্মাদনাকে নিরাপদ রাখতে স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
সরজমিনে দেখা যায়, ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে সকাল থেকেই বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামমুখী দর্শকের ঢল। দুপুর না গড়াতেই গেইটগুলোতে উপচে পড়ে ভিড়। টিকিট কিংবা গ্যালারিতে জায়গা না থাকলেও থামেনি দর্শকের স্রোত। কেউ দেয়াল টপকে, কেউ বাধা উপেক্ষা করে ঢোকার চেষ্টা করেন স্টেডিয়ামে। দর্শকের চাপে মূল গেইটগুলোতেও তৈরি হয় ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা। একপর্যায়ে গেইট ভেঙে শত শত দর্শক ঢুকে পড়েন মাঠে। ভেতরে কয়েক হাজার দর্শক, বাইরে অপেক্ষায় আরও কয়েক হাজার।
রামু থেকে খেলা দেখতে আসা আরমান বলেন, কক্সবাজার স্টেডিয়াম এলাকায় এসেছি বেলা ১২টার দিকে। তারপর থেকে টিকিটের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু টিকিট মিলেনি। সব টিকিট নাকি বিক্রি হয়েছে গেছে। তাই স্টেডিয়ামে ঢুকে খেলা দেখা হলো না।
স্টেডিয়াম মার্কের্টের সেলুনের দোকানদার সানোয়ার সৈকত বলেন, “প্রচুর দর্শক। দর্শকরা টিকিট না পেয়ে আজকে আমার দোকানের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলতে চাচ্ছে। পাশের একটি বিল্ডিংয়ের গ্রিলও ভেঙে ফেলেছে দর্শকরা। এ কারণে আমরা দোকান বন্ধ করে এখন নিজের দোকান পাহারা দিচ্ছি।”
চকরিয়া থেকে আসা দর্শক ইউনুস বলেন, “আমরা চকরিয়া থেকে খেলা দেখতে এসেছি। দুপুর ১টা থেকে এসে বসে আছি, কিন্তু এখনো টিকিট পাচ্ছি না। এখানে ৩০০-৪০০ টাকা করে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। আগে থেকেই টিকিট নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। তারা বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে সাধারণ দর্শকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে।”
চকরিয়া পৌরসভা এলাকা থেকে আসা মিজানুর রহমান বলেন, টিকিটের জন্য ১০০ টাকা করে দিয়েছি। কিন্তু টিকিট নেওয়ার পরও এই ভয়াবহ জ্যামের কারণে স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারছি না। মানুষের এমন ভিড় যে, কেউ টিকিট পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না। আবার যারা টিকিট পেয়েছেন, তারাও ভিড়ের কারণে ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
স্টেডিয়ামের এমন অবস্থা হবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। এত দর্শক হয়েছে যে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আমার প্রিয় খেলোয়াড়দের খেলা দেখতে এসেছি, কিন্তু এখন নিজেরই স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারছি না।
এদিকে গ্যালারিতে জায়গা না পেয়ে কেউ ছাদে, কেউ পানির ট্যাংকে, আবার কেউ গাছে উঠে খেলা দেখেন। ঝুঁকি থাকলেও প্রিয় দলের ফাইনাল দেখতে মরিয়া দর্শকরা।
গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক মো. ইব্রাহীম বলেন, প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পাইনি। একবার বন্ধ করে দেওয়ার পর আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি, সেখানেও একই অবস্থা। অনেক কষ্টে টিকিট পাওয়ার পর গেটে এসে দেখি প্রচণ্ড ভিড়। প্রায় এক ঘণ্টা ধাক্কাধাক্কি ও পুলিশের লাঠিচার্জের মধ্যে কোনো রকমে স্টেডিয়ামে ঢুকতে পেরেছি।
দর্শক আবদুর রহিম বলেন, “স্টেডিয়ামের গ্যালারিকে ধারণক্ষমতা ৫ হাজার দর্শক। স্টেডিয়ামে প্রায় ৭ হাজার দর্শক প্রবেশ করেছে। কিন্তু আরও প্রায় ১২ হাজার দর্শক মাঠে ঢুকতে পারেননি। যারা ঢুকতে পারেননি, তারা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।”
২০২৫ সালের ফাইনালেও অতিরিক্ত দর্শকের চাপকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। এবার অবশ্য মাঠজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা।
রামু-চকরিয়ার বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনালে মাঠের লড়াইও ছিল জমজমাট। দর্শকের এমন উন্মাদনাকে নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত রাখতে দ্রুত স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর দাবি ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের।
কক্সবাজার জেলা খেলোয়াড় সমিতির সমন্বয়কারী ফাহিমুর রহমান বলেন, স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার। আমরা ৪ হাজার টিকিট বিক্রি করেছি। কিন্তু ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। যারা গ্যালারিতে জায়গা পাননি, তাদের জন্য মাঠে প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে ফাইনাল আয়োজন করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আরও বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা বাড়াতে স্টেডিয়ামের কয়েকটি গ্যালারির কাঠামো দুই-তিন তলা করা গেলে ধারণক্ষমতা অনেক বাড়বে। এতে ভবিষ্যতে আরও বেশি দর্শককে সুশৃঙ্খলভাবে খেলা দেখার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করছেন। দর্শকরা যাতে নিরাপদে ও সুশৃঙ্খলভাবে খেলা উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। আমরা আশা করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দর্শকদের সহযোগিতায় সুন্দরভাবে খেলা শেষ করতে পারব।
বর্তমান সময়ের তুলনায় এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা অনেক কম। তাই সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, কক্সবাজারের ক্রীড়া উন্নয়নে বাফুফে সবসময় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে শুধু স্টেডিয়াম নয়, আশপাশের সুইমিং পুল ও অন্যান্য অবকাঠামোও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কক্সবাজারকে পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি স্পোর্টস ট্যুরিজমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজারে ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।
ফাইনাল ম্যাচের ৯০ মিনিট গোলশূন্য ড্রয়ে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। স্নায়ুচাপের লড়াইয়ে চকরিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় রামু উপজেলা।