কক্সবাজারের সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনসহ সমুদ্রসৈকতের কলাতলী পয়েন্টের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করেছে প্রশাসন। উচ্ছেদ করা হয়েছে ফুটপাত ও বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা প্রায় দেড়শ অবৈধ স্থাপনা। একই সঙ্গে সৈকতের বালিয়াড়িতে বসানো কিটকটেও পাওয়া গেছে ব্যাপক অনিয়ম। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন এলাকা ও কলাতলী পয়েন্টের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করেছে জেলা প্রশাসন। উচ্ছেদ করা হয়েছে ফুটপাত ও বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা প্রায় দেড়শ অবৈধ স্থাপনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারের কলাতলী মোড়ে অবস্থিত সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনটি দেশের ইন্টারনেট সংযোগের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পয়েন্ট। কিন্তু এই স্থাপনার চারপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য অবৈধ দোকান। এমনকি স্থাপনার ভেতরেও ফ্রিজ, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা ও আসবাবপত্র নিয়ে রীতিমতো সংসার পেতেছিলেন দখলদাররা। গুরুত্বপূর্ণ এই সীমানার ভেতর চাষাবাদ করার পাশাপাশি নিরাপত্তারক্ষী নিজেই ডাবের ব্যবসা খুলে বসেছিলেন।
সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের নিরাপত্তারক্ষী ওসমান গণি বলেন, বর্তমানে আশপাশের অবৈধ দোকানগুলো ভাঙা হচ্ছে এবং এতে করে এলাকাটি কিছুটা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এখানে যে সাবমেরিন কেবলটি রয়েছে, সেটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই কেবল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জায়গাটি বাগানের মতো করে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং নিরাপত্তার জন্য একজন প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে টানা সাবমেরিন কেবলটি এই জায়গা দিয়ে প্রবেশ করেছে। তাই কেবলটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। কিন্তু আশপাশে অবৈধভাবে দোকান বসানো, কুটির তৈরি করা কিংবা আগুন জ্বালানোর মতো ঘটনা ঘটলে তা কেবলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এজন্য নিয়মিতভাবে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে যাতে কেউ এখানে দোকান না বসায় বা কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না করে।
তিনি আরও বলেন, চারপাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা থাকায় সব সময় সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজনকে নিষেধ করলে অন্য জায়গায় আবার কেউ বসে পড়ে। অনেক সময় বিপদে পড়ে বা সুযোগ বুঝে লোকজন জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে, এতে বাগানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তবে স্থানীয় কিছু মানুষের অভিযোগ রয়েছে যে এখানে দোকান বসাতে টাকা নেওয়া হয়। এ বিষয়ে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, তিনি নিজেও এখানে ডাবের ব্যবসা করেন এবং পাশাপাশি অন্য কাজও করেন। কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবার (১৬ মার্চ) অভিযানের শুরুতেই সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলো গুড়িয়ে দেয় প্রশাসন। এরপর শুরু হয় কলাতলী সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে উচ্ছেদ অভিযান। সেখানে লোহার তৈরি বেশ কিছু স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয় এবং ট্রাকে তুলে সরিয়ে নেয়া হয়।
এভাবে কলাতলী সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ও রাস্তার দুই পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা দেড়’শোর বেশি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানের সময় অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগেও তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেন।
এরপর অভিযান চালানো হয় সৈকতের বালিয়াড়িতে বসানো কিটকটে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে নানা অনিয়ম। যাদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পাঁচটি কিটকট, তারা বসিয়েছে দশটি। আবার যাদের নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর অনুমতি ছিল, তারা বসিয়েছে অন্যত্র। যেসব কিটকটের মালিকানা পাওয়া যায়নি সেগুলো জব্দ করে প্রশাসন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বালিয়াড়িতে সারিবদ্ধ কিটকট বসানোর কারণে পর্যটক ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কলাতলী সৈকতের কিটকট (ছাতা) ব্যবসায়ী আবুল কাশেম লালু বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে ডিভাইন এলাকার পাশে একটি বড় খাল সৃষ্টি হয়। ড্রেনের পানি নামতে নামতে সেখানে বড় গর্ত ও খালের মতো অবস্থা তৈরি হওয়ায় তখন সেখানে চেয়ার বসানো সম্ভব ছিল না। সেই সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পাশের খালি জায়গায় এসে চেয়ার বসানোর জন্য অনুমতি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৫ বছর ধরে এখানে চেয়ার বসিয়ে ব্যবসা করে আসছেন তারা। কিন্তু হঠাৎ করে এখন ম্যাজিস্ট্রেট এসে চেয়ারগুলো সরিয়ে নিতে বলছেন, যা তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত।
আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাসির বলেন, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অনেকের কাছে কোনো মালিকানা নেই, এমনকি কার্ডও নেই-তবুও তারা ১০-১৫টি করে চেয়ার বসিয়ে ব্যবসা করছেন। এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজারের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। যাদের বৈধ কার্ড আছে, তারা যেন সেটি নিয়ে এসে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন। এতে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মাঈনউদ্দিন শাহেদ বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত তিনটি পয়েন্টে আগে প্রায় ৫০০টি চেয়ার ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ১৫০০টিরও বেশি চেয়ার বসানো হয়েছে। এতে করে সৈকতের অবস্থা এমন হয়ে গেছে যে, পর্যটকদের নামার জন্য আগের মতো আর পর্যাপ্ত জায়গা নেই। আগে বিভিন্ন পয়েন্টে ৫০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত খোলা জায়গা থাকলেও এখন অনেক জায়গায় ৫ থেকে ১০ ফুট জায়গাও রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সৈকতে চেয়ার-ছাতা বসানোর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন এক ধরনের হিড়িক পড়েছে। এতে করে যাদের পাঁচটি চেয়ার বসানোর অনুমতি ছিল, তারাও ১০টি করে চেয়ার বসাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, এই অনিয়ম দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন। কারণ অতিরিক্ত চেয়ার বসানোর ফলে সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসন বলছে, সমুদ্রসৈকতের শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন (পর্যটন সেল)-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনজু বিন আফনান বলেন, বালিয়াড়ি দখল করে গড়ে ওঠা দোকানগুলো ইতোমধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফুটপাত দখল করে বসানো দোকানগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় যারা বিভিন্নভাবে দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলেছিল, সেগুলোও উচ্ছেদ করা হয়েছে। খুব শিগগিরই ওই এলাকার পুরো অংশ পরিষ্কার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘কিটকট’ বসানোর বিষয়টিও প্রশাসনের নজরে এসেছে। অনেকেই যে অনুমোদন নিয়েছে তার চেয়ে বেশি কিটকট বসিয়েছে, আবার কেউ কেউ অনুমোদন ছাড়াই বসিয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে বসানো কিটকটগুলো পর্যায়ক্রমে যাচাই করা হবে এবং যেগুলো অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হবে সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি জানান, যাচাই-বাছাই করে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে এবং সৈকতের শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর টানা পাঁচ দিনের অভিযানে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট থেকে প্রায় আটশ’ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে জেলা প্রশাসন।