সাইফুল আফ্রিদি
সকালের সমুদ্র। রোদ আলো ঝলমল দিনে সার্ফিংয়ে নামেন ফাতেমা। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে সৈকতের পাশে নিজেদের সার্ফিং ক্লাবেই ফেরেন এশিয়ান গেমসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতেমা।
এসেই গোসল সারেন, ক্লাবের পাশেই দোকান। চা-বন খান অথবা সিঙ্গারা। বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে নামার আগে ঠিক এভাবেই নিজেকে তৈরি করতে হচ্ছে ফাতেমাকে।
ফাতেমার মতো অন্য সার্ফাররাও সার্ফিং শেষে এসব খাবার খান। যা ক্ষুধা নিবারণ করলেও ক্যালরি পূরণ করতে পারে না।
শনিবার সকালের এমন একদিনে সার্ফিং শেষে ক্লান্ত ফাতেমা। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১২টা। সার্ফিং ড্রেস পরিবর্তন করার আগেই চা-বন ভিজিয়ে খাচ্ছেন। জানতে চাইলে স্মিত হেসে বলেন, সার্ফিং শেষে খাবার বলতে চা-বন, রুটি কিংবা দুয়েকটা সিঙ্গারা। আমাদের তো কোন স্পন্সর নেই, সরকারের কোন সহায়তাও নেই।
ফাতেমা বলেন, সকাল বেলা খেয়ে না খেয়েই সার্ফিংয়ে আসতে হয়। কক্সবাজার শহরের বাদশাহঘোনা এলাকা থেকে ৪ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে লাবণী পয়েন্ট থেকে একটু উত্তরদিকে ঝাউবনের পাশেই সার্ফ গার্লস এন্ড বয়েজ ক্লাবে আসেন ফাতেমা। সেখান থেকেই ফাতেমা সার্ফার হয়ে উঠেন। তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সেইদিনের ফাতেমা এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। ৭ বছর এভাবেই নিজেকে ধরে রেখে এশিয়ার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে মেলে ধরবার সুযোগ আসে।
বন্ধুদের কাছ থেকে সার্ফিংয়ের কথা শুনে তৃতীয় শ্রেণিতে থাকতেই কক্সবাজার সৈকতে আসা শুরু তাঁর। প্রথমবার বোর্ডে উঠেই ভালোভাবে দাঁড়াতে পারেননি, পড়ে গিয়ে কেঁদেছিলেন। কয়েকদিন প্রশিক্ষণের পর মায়ের বাধা ও সমাজের নানা কথায় প্রায় দুই সপ্তাহ সার্ফিং থেকে দূরে ছিলেন। পরে আবার নিয়মিত প্রশিক্ষণে ফেরেন। পরেরবার বোর্ডে দাঁড়াতে পারার সেই মুহূর্তেই তাঁর আনন্দের সীমা ছিল না।
সমাজের কটু কথা শুনতে হয়েছে তাকে। সমাজের নানা কথায় পরিবার তাকে বাঁধা দেয়। বাবা নেই ফাতেমার, ছোটবেলায় বাবা হারানোর সেই সংসার অন্যের বাড়িতে কাজ করে টেনে নিয়ে যান মা। কাজ করতে গিয়ে ফাতেমার বিষয়ে নানা কথা শোনে সার্ফিং বারণ করে দেন মা। কিন্তু ফাতেমার লক্ষ্য ছিলো সার্ফিংয়ে সে ভালো কিছু করবে, কে কি বলছে, সেসব কানে নেননি ফাতেমা।
ফাতেমা বলেন, শুরুতে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। সার্ফিং করে কি হবে, বিয়েই তো করতে হবে। এমনকি ফাতেমা বলেন, তার অনেক বান্ধবীও তার সাথে এমন আচরণ করে যেন সার্ফিং একটা খারাপ কাজ।
ফাতেমা দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, কিন্তু আমি তো জানি সার্ফিং একটি ভালো খেলা। যে খেলার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরা যায়, দেশের সুনাম বয়ে আনা যায়। তাই টানা ৭ বছরে সবকিছুকে পেছনে রেখে, সমাজের মানুষের কটুকথায় কান না দিয়ে আমি এতটুকু এলাম।ইন্ডিয়ায় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশীপ খেলতে পেরে আমি ভীষণ খুশি হই। এরপর আরো চেষ্টা করি, সার্ফিংয়ে আমার আরও আগ্রহ বাড়ে। আমি চাই সার্ফিংয়ে আমার ক্যারিয়ার হোক। সেজন্য সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা যেন পায় আমাদের ক্লাব। কেননা আমি ছাড়াও আরও নারী সার্ফার আছে। সার্ফিংয়ে তাদের ভবিষ্যত ও ক্যারিয়ার গড়ে উঠলে বাংলাদেশ আরো ভালো জায়গায় যাবে।
এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশীপ গেমসে অংশগ্রহণকারী নারী সার্ফার ও ফাতেমার বান্ধবী মাহিমা আক্তার মিলি বলেন, অনেকেই সার্ফিং করতে আসে, কিন্তু ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না থাকায় একসময় ঝরে পড়ে, কেউ কেউ বিয়ে করে সংসার শুরু করে দেয়। এত বাধার পরও ফাতেমা টিকে থেকে আজ এশিয়ান গেমস পর্যন্ত পৌঁছেছেন।
এর আগে ইন্ডিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ গেমসে অংশ নিয়েছিলেন ফাতেমা, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে বলে জানান তিনি। এবার এশিয়ান গেমসে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে উচ্ছ্বসিত এই কিশোরীর স্বপ্ন জাপানের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো।
তবে এই স্বপ্নের পথটাও খুব সহজ নয়। ফাতেমা যে সার্ফবোর্ড নিয়ে প্রতিদিন সার্ফিংয়ে নামেন সেই সার্ফবোর্ডটিও একটি সেকেন্ডহ্যান্ড সার্ফবোর্ড। ফাতেমা বলেন, একটি সার্ফবোর্ড নিয়ে দুই বছর পর্যন্ত সার্ফিং করি। আমাদের কোচ রাশেদ দেশের বাইরের বন্ধুদের কাছ থেকে এসব সার্ফবোর্ড ও অন্যান্য ইকুয়েপমেন্ট এনে ক্লাবটি গড়েছেন।
একই কথা বললেন ফাতেমার সঙ্গে প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া বাংলাদেশ জাতীয় সার্ফিং দলের ৪ বারের চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ মান্নানও (২০)। ১৪ বছর ধরেই সার্ফিং ক্যারিয়ার তার। মালদ্বীপ, ভারতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশীপ গেমসও খেলেছেন কয়েকবার। ন্যাশনাল সার্ফিং কম্পিটিশনে প্রথম হয়েই এশিয়ান গেমসে কোয়ালিফাই হন মান্নান। তিনিও বলেন, পুরনো বোর্ড দিয়েই সার্ফিং করতে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের সাথে লড়তে হচ্ছে অথচ অন্যান্য দেশের সার্ফাররা নিত্য নতুন ইকুইপমেন্ট দিয়ে প্রস্তুতি সারছে। অথচ আমাদের অনেক সাবধানে সার্ফিং করতে হয় যেন বোর্ড ভেঙে না যায়, ব্যয়বহুল হওয়ায় এই বোর্ড কিনতে পারি না। সরকারি সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হয়তো আমরা আরও ভালো করতে পারতাম।
সার্ফিংয়ের পাশাপাশি মান্নান পরিবারের খরচ চালাতে ঝিনুকের ব্যবসা করেন। এতো ঘাটতির মাঝেও দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে একবুক আশা ও অক্লান্ত পরিশ্রম করে এশিয়ান গেমসে নিজেদের জায়গা করে নেয় ফাতেমা ও মান্নান।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত হবে ২০তম এশিয়ান গেমসের আসর। সেখানে সার্ফিংয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন মো. মান্নান ও ফাতেমা আক্তার(১৬)। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী ও পুরুষ সার্ফার হিসেবে অংশ নিয়ে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবে ফাতেমা ও মান্নান। কিন্তু ইতিহাস গড়ার এই মুহূর্তেও স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশের সার্ফিং দল।
দীর্ঘদিন যে কোচের হাত ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সার্ফাররা, বাংলাদেশ জাতীয় সার্ফিং দলের কোচ ও বাংলাদেশ সার্ফ গার্লস এন্ড বয়েজ ক্লাবের সভাপতি রাশেদ আলম দলের সঙ্গে জাপানে যেতে পারছেন না। তাঁর পরিবর্তে যাচ্ছেন সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা। যিনি সার্ফারদের সঙ্গে কখনো প্রশিক্ষণ করেননি বলে অভিযোগ দুই খেলোয়াড়ের।
মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তারও হতাশ কোচ বাদ পড়ার সিদ্ধান্তে। তারা বলেন, সার্ফিংয়ের সময় দিকনির্দেশনা থেকে শুরু করে ঢেউ, আবহাওয়া ও পরিবেশ সম্পর্কে কোচই তাঁদের সবচেয়ে ভালোভাবে গাইড করতে পারেন। তাঁদের অভিযোগ, দলের সঙ্গে যাকে নির্বাচিত করা হয়েছে, তাঁর সঙ্গে তাঁদের কখনো অনুশীলন বা প্রশিক্ষণ হয়নি। আন্তর্জাতিক আসরে তিনি কীভাবে তাঁদের গাইড করবেন, সেই আশঙ্কায়।
তবে বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশনের ফোকালপার্সন সাইফুল্লাহ সিফাত এই সিদ্ধান্তকে অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করে নিজেকে দলের জন্য যোগ্য মনে করছেন। তিনি বলেন, দলের সঙ্গে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন যিনি সার্ফিংয়ের বিভিন্ন বিষয় বুঝবেন। তাঁর দাবি, কোচের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি আছে, আর তাঁর নিজের সব বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকায় অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে নির্বাচন করেছে। এবিষয়ে জানতে চেয়ে বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী রুকনকে কয়েকবার ফোন দিলেও ফোনে পাওয়া যায়নি তাকে।
ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনা, সীমিত সুযোগ। এমনকি সরকারি কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ভঙ্গুর একটি সার্ফিং টেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাচ্ছে রাশেদ আলম। বাংলাদেশ ন্যাশনাল সার্ফিং দলের কোচ রাশেদ আলম বলেন, সীমিত সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির মধ্যেও সার্ফাররা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দলের সঙ্গে কোচ না থাকায় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনি নিজেও শঙ্কিত।
তিনি বলেন, অন্য দেশগুলো যেখানে কোচসহ পূর্ণাঙ্গ দল নিয়ে এশিয়ান গেমসে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের সার্ফারদের কোচ ছাড়া পাঠানো হচ্ছে। এতে বিশেষ করে ছেলেদের পারফরম্যান্স নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।
বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের আরেকটি বড় সংকট সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। বর্তমানে সেকেন্ডহ্যান্ড সার্ফিং সরঞ্জাম ব্যবহার করেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে সার্ফারদের, অথচ এশিয়ার অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়েরা নামছেন নতুন ও আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে।
কোচ রাশেদ আলমের আশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো, ভালো মানের সরঞ্জাম সরবরাহ, সার্ফারদের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা এবং একটি আধুনিক সার্ফিং ক্লাব গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ এই খেলায় আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। এই বৈষম্যই বাংলাদেশের সার্ফারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তারপরও থেমে নেই বাংলাদেশের সার্ফাররা। সীমিত সরঞ্জাম, সীমিত সুযোগ, এক বেলার বন-চায়ে কক্সবাজারের ঢেউয়ে নিজেদের তৈরি করে এবার তাঁরা যাচ্ছেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের মঞ্চে।