মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর,এডভোকেট
বিগত ২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা পুলিশের উদ্যোগে শহরে মাদক বিরোধী র্যালি হয়েছে ও বিকেলে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি শহীদ সুভাষ হলে জেলা পুলিশের আয়োজনে এক সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা মাদকের গডফাদারদের কোনভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক ক্রয় বিক্রয়ের ও সেবনকারীদের পাশাপাশি মাদকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরো বলেছেন, আপনারা দেখেছেন এখানে বিশাল বড় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের গডফাদাররা এমপি হয়েছেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন। যে ব্যক্তি মাদক ব্যবসা করে এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান হন তিনি তো মাদকের বিস্তারই ঘটাবেন। এগুলোই ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। সম্প্রতি এ ধরনের কথা পবিত্র সংসদেও আলোচিত হয়েছে। সবকিছুর ইংগিত হলো উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি বদি ও কক্সবাজার জেলার দিকে। বদি দুই বছরের অধিক কাল ধরে হাজতবাসে আছেন। সম্প্রতি বদিকে বহুল আলোচিত একরাম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানা যায়। ইতিপূর্বে বদিকে দুদকের মামলায় দোষী সাব্যস্থ করে দন্ডিত করা হলে দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। কিন্তু আমজনতার প্রশ্ন, তার বিরুদ্ধে মাদকের কোন মামলা নাই কেন? এখনো পত্রিকায় প্রায় প্রতিদিন মাদক উদ্ধারের সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন বদী কারাগারে আটক থাকলেও এখন মাদক ব্যবসা কে বা কারা করছে?
এতদিন মাদকের ব্যাপারে শুধু কক্সবাজার জেলাকেই দায়ী করা হলেও গত ৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার পেছনের পৃষ্ঠায় ’১০৫ পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে মাদক’ বড় শিরোনাম দিয়ে প্রকাশিত তথ্যবহুল সংবাদে প্রকাশ সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলার সীমান্ত, বন্দর ও সামুদ্রিক এলাকাগুলো দিয়ে নানা কায়দায় ২৭ ধরনের মাদক ভারত সীমান্তের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার। উল্লেখিত ১৮টি জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের ১৭ শতাংশ ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় এবং বাকী ৮৩ শতাংশ মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা থেকে দেশের অসৎ ও লোভী লোকেরা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যবসায় পৃষ্টপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক ও বিক্রির নেটওয়ার্কে প্রতি বছরই লোকসংখ্যা বাড়ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ’অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’ অনুযায়ী তথ্যবহুল প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি, র্যাব ও কোস্টগার্ড সহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদ্ধারকৃত মাদক, আসামী ও মামলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ২৬ হাজার ৯০৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪ হাজার ৭৮৯ কেজি হেরোইন, ২২৭ কেজি কোকেন, ৩৭৮ কেজি আফিম, ১১ লাখ ১৫ হাজার ৮০৮ কেজি গাজা, ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ১৫৩ বোতল ফেনসিডিল, ২২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৬টি অ্যাম্পুল ইনজেকটিং ড্রাগ ও ৩৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৫২ বোতল বিদেশী মদ জব্দ করা হয়েছে। এই সময়ে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৮টি মামলায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৬৫১ জন আসামী গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই বক্সের ভিতরে ’সিন্ডিকেটের স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রাম’, ’রাজশাহীতে ৩০০ গডফাদার’, ’উত্তরের ওপারে অর্ধশত কারখানা’ এবং ’ইয়াবার আরেক রুট সিলেট’ নামের ছোট শিরোনাম দিয়ে আরো ৪টি তথ্যবহুল সংবাদ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
ইদানিং কক্সবাজার সহ দেশে বাসাবাড়ী, দোকান, স্থাপনার বিদ্যুতের সার্ভিস লাইনের তার চুরি হওয়া মহামারির আকার ধারণ করেছে। অল্প দশ/বিশ হাজার টাকার মূল্যের তার চুরির মামলা নিতে থানা-পুলিশ যেমন আগ্রহী নন, ভুক্তভোগী মানুষও থানা পুলিশ করা অধিকতর হয়রানী মনে করেন। কক্সবাজার পৌরসভার স্ট্রিটলাইটগুলো নিয়মিত না জ্বালিয়ে রাস্তা অন্ধকার রেখে যেন চোরদের পরোক্ষ সহায়তা করা হচ্ছে। নির্বাচিত পৌর পরিষদ না থাকায় জবাবদিহিতাও নাই। দেশের অধিকাংশ চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি, হত্যার ঘটনায় মাদক বা মাদকাসক্তরাই জড়িত মর্মে সংবাদপত্রের দাবী অভিজ্ঞ মহল সমর্থন করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মাদকাসক্ত লোক আছে। প্রায় প্রতি দিন সংবাদপত্রের পাতায় দেশের কোন না কোন জায়গায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের খবর দেখা যায়। অভিজ্ঞদের মতে দেশে যে পরিমাণ ইয়াবা বা অন্য মাদকদ্রব্য চোরাচালানীর মাধ্যমে আমদানী করা হয় তার অনুমান ১০% ভাগ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধৃত হয়। বাকী ৯০% দেশে নিরাপদে প্রবেশ করে এবং সেবন বা ব্যবহার করা হয়। মাদকের বিরুদ্ধে সকল সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হলেও তা কখনও বন্ধ হয় নাই। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আমদানী বা পাচার বন্ধ করার অজুহাতে ওসি প্রদীপের আমলে শুধু টেকনাফ থানাধীন এলাকায় ২০৪ জন নাগরিককে ইয়াবা পাচারে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে বলে তখন প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। যারা ইয়াবা পাচার বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে নিজেরাই দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল টাকা উপার্জন করায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ডকুমেন্টারী তৈরী করতে গিয়েই মেজর (অব) সিনহা খুন হন এবং সে হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ গং বিচারে মুত্যুদন্ডে ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। উচ্চ আদালতে দন্ডাদেশ বহাল রাখা হয়েছে। কিন্ত ইয়াবা পাচার এখনও অব্যাহত আছে কেন? তার উত্তর হল চাহিদা থাকলে সরবরাহ বৈধ বা অবৈধ পথে অবশ্যই আসবে, তা অর্থনীতির ধর্ম।
মাদক চোরাচালানী/আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে প্রচলিত আইন সংশোধন করে ইয়াবা সেবনকারী বা মাদক সেবনকারীদের দ্রুত সনাক্ত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি জেলায়-উপজেলায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু মাদক পাচারকারীদের ধরে বিশেষ আদালত গঠন করে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলে ইয়াবা আমদানী বন্ধ হবে না। সরকারী/বেসরকারী চাকুরী, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, আমদানী রপ্তানীসহ ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা পেশাজীবীদের সনদ প্রদানের সময়, কমিউনিটি পুলিশের সদস্য হওয়ার জন্য, রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যপদসহ নেতৃত্বের পদ দেওয়ার আগে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাথে মাদকাসক্ত নন মর্মে ডোপ-টেস্ট রির্পোট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তারা সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন বলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যাগ নিলে দেশে মাদক সেবন কঠোরভাবে নিরুৎসাহীত করা ও বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয়। হীন রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সরকারী দল ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে মাদকসেবনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মসজিদভিত্তিক, সমাজভিত্তিক, মহল্লাভিত্তিক সর্বদলীয় মাদকসেবন বিরোধী কমিটি গঠন করে চিহিৃত মাদকসেবনকারীদের ও মাদকসেবক পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেশে মাদকসেবন বন্ধ করার মাধ্যমে মাদকের চাহিদা কমিয়ে ইয়াবা ও মাদক পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে মাদক ব্যবসা যেমন স্বংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে, মাদকের পৃষ্টপোষক, ব্যবসায়ী,বাহক,বিক্রেতা ও গডফাদারও আর সৃষ্টি হবে না। দেশে চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, হত্যার মত জঘন্য অপরাধপ্রবণতা কমে অবনতিশীল আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নতি হবে।