বিদায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ‘কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়নি বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়কালে দেশে বিরাজমান সামগ্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক, গণতান্ত্রিক, আইনি পরিবেশ ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলছে তারা।
এ বছরের ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে বুধবার ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এমএসএফ।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর স্থানীয় ‘হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার’দের মাধ্যমে যাচাই করে এ প্রতিবেদন তৈরি করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজনৈতিক সহিংসতা
এমএসএফ এর প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫ হাজার ৬০৪ জন।
তাদের মধ্যে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৯৭ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ৬৫ জন বিএনপি, ৮ জন আওয়ামী লীগ, ৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং ১০ জন বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও বয়সের সাধারণ নাগরিক, যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এসব সহিংসতার মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার পর মনোনয়নপত্র ও প্রচারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ২৬টি ঘটনায় হতাহত হয়েছেন ২৫২ জন। তাদের মধ্যে তিনজন নিহত এবং ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ১৬৯টি ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ২৩৪ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে ৪৭ জন নিহত এবং ১৮৭ আহত হয়েছেন।
২০২৪ সালে সরকার পতন ও জুলাই-অগাস্ট গণভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এ বছর ৬৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৭ হাজার ৭৮০ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়েছে ও ১১ হাজার ১৭৯ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
এসব মামলার মধ্যে ২৯টিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ৩ হাজার ৬৯৫ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে ফেব্রুয়ারিতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হওয়া 'অপারেশন ডেভিল হান্ট' এর আওতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২২ হাজার ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৩১৩ জন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক।
এছাড়া সারাদেশে পুলিশের বিশেষ অভিযানে মামলা ও ওয়ারেন্টভুক্ত এবং অন্যান্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ লাখ ১২ হাজার ৮০০ জন।
আগের তুলনায় আদালতে মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়লেও, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতে বর্তমানে ৪৫ লাখ ১৬ হাজার ৬০৩টি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারী যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসারত ছিলেন, তাদের মধ্যে এ বছরে ৪ জন মারা গেছেন।
২০২৫ সালে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ১৯টি ঘটনা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ১৩ জন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। থানা হেফাজতে দুইজন নারীসহ ছয়জন আসামি আত্মহত্যা করেছেন।
২০২৫ সালে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে পালাতে গিয়ে আটজনের মৃত্যুর তথ্য এসেছে প্রতিবেদনে।
এমএসএফ বলছে, “যেখানে নাগরিকদের সুরক্ষার নৈতিক দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর, অথচ দেখা যাচ্ছে পুলিশ দেখামাত্র ভয়ে পালাতে গিয়ে মৃত্যুর মত ঘটনা ঘটছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।”
২০২৫ সালে কারা হেফাজতে ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতাজনিত কারণে। ১ জন আত্মহত্যা করেছেন। ১ জন গণপিটুনির পর কারা হেফাজতে মারা গেছেন। ১ জনের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু এবং নির্যাতনে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দুজন ভারতীয় নাগরিক কারাগারে অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেছেন। কারা হেফাজতে মৃতদের মধ্যে ৪১ জন কয়েদি, ৭৩ জন হাজতি এবং ১ জন নারী হাজতি আত্মহত্যা করেছেন।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা
২০২৫ সালে ২ হাজার ১৪ জন নারী এবং ১ হাজার ৯২৮ জন শিশু ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছে।
এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৩৩১টি, দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৬ জন নারী, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন ২০জন নারী, ধষর্ণচেষ্টার শিকার ১৪০ জন ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২০৩ জন নারী।
অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছে ৫ জন নারী। এছাড়াও প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৬ জন। আত্মহত্যা করেছেন ২৮৩ জন নারী। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৬ জন নারী।
অপহরণ করা হয়েছে ২০ জন নারীকে, নিখোঁজ রয়েছেন ২৬ জন নারী। ৫৯জন নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুসহ মোট ৫৩২ জন নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৪ জন প্রতিবন্ধী নারী।
শিশু ও কিশোরী সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৪৫২ জন শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৭৮ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে ২৫ জন শিশু ও কিশোরীকে।
যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২১ জন শিশু কিশোরী এবং ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৭৭ জন শিশু কিশোরী। এছাড়াও প্রতিবন্ধী শিশু কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৮ জন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৩৫ জন জীবিত ও ৫১ জন মৃত, মোট ৮৬ জন নবজাতক পাওয়া গেছে।
পিটিয়ে হত্যা ও অজ্ঞাতনামা লাশ
এ বছরে অন্তত ৪২৮টি গনপিটুণির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৬৬ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৬০ জন আহত হয়েছেন। ২২০ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
চলতি বছরে ৬৪১টি অজ্ঞতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে যার মধ্যে ২২ জন শিশু, ৬ জন কিশোর ও ৭ জন কিশোরী, ১৫৭ জন নারী ও ৪১৫ জন পুরুষ।
মাজারে হামলা ভাংঙুর-অগ্নিসংযোগ
২০২৫ সালে মাজার ও মুক্তচিন্তা বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা লংঘনের ২১টি ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে সিলেটের ৪টি মাজার, কুমিল্লায় ৪টি মাজার, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মলমূত্র নিক্ষেপ করা, ঠাকুরগাঁয়ে মাজারে হামলা চালিয়ে ৩টি কবর ভাঙচুর করা। দিনাজপুর ঘোড়াঘাটে ওরশ আয়োজনের প্রস্তুতির সময় একটি মাজারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
রাজবাড়ীর দরবার শরীফ, রাজশাহীর খানকা শরীফ, নেত্রকোণায় পীরের আস্তানা, ময়মনসিংহে খানকা শরীফে অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কুষ্টিয়ায় লালন ফকিরের আখড়ায় হামলার হুমকি, ময়মনসিংহে চার মাস আগে বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন ফকিরের জোড়পূর্বক চুল কর্তন, সিলেটে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এর পথযাত্রায় হামলা হয়।
৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার শরিফে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় একজন নিহত হন। ২৩ অগাস্ট মারা যাওয়া নুরাল পাগলার লাশ মাটি থেকে কয়েক ফুট উপরে দাফন করার অভিযোগে ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি ’মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেয় এবং কবর থেকে ৫ সেপ্টেম্বর লাশ তুলে পোড়ানো হয়।
মতপ্রকাশের অধিকারের লঙ্ঘন
এমএসএফ এর প্রতিবেদন বলছে, এ বছর ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হত্যা, হামলা, হুমকি, আইনি হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আক্রান্ত সাংবাদিকদের মধ্যে নিহত হয়েছেন একজন। ২৯৫ জন সাংবাদিক তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন।
লাঞ্ছিত ও হুমকির শিকার ১৬৩ জন সাংবাদিক, আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৭০ জন।
আইনি হয়রানির শিকার সাংবাদিকদের নামে ৪৬টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ১২ জন।
মামলাগুলোর মধ্যে ৭টি মামলা হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে।
আর অন্য মামলাগুলো হয়েছে সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, চাঁদাবাজি, মানহানি এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ।
এছাড়া এ বছর ৯ জন সাংবাদিকের ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারীসহ ৫ জন সাংবাদিকের আত্মহত্যার তথ্য এসেছে। দুই জন ‘দুস্কৃতকারীদের’ হাতে নিহত হয়েছেন। একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
২০২৫ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন/সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলাসহ মোট ২৫টি মামলায় ৫৫ জন আসামির মধ্যে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বলছে, এ বছর ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনা গত বছরের তুলনায় কম হলেও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে।
চলতি বছরের শেষদিকে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের চার্চসহ, স্কুল কলেজের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, ২১টি চার্চ ও ব্যক্তির কাছে উড়ো চিঠি দিয়ে হুমকি এ ধরনের সহিংসতায় ‘এক নতুন মাত্রা’ যোগ করেছে।
যশোরের অভয়নগরে একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দু গ্রামে হামলায় ১৮টি এবং রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ধর্ম নিয়ে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২১টি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়িতে এক আদিবাসী কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। সে সময় মামলা নিতে পুলিশের ‘অনীহা’, মামলা নিয়ে ডাক্তারি পরীক্ষায় দেরি করে ‘আলামত নষ্ট করা’, দুর্বল এজাহার করে আসামিদের জামিন নিশ্চিত করার মতে অভিযোগ ওঠে।
দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র অবরোধ কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত হন। রামেসু বাজার এলাকায় আগুন দেওয়া হয় প্রায় অর্ধশত বসতবাড়ি ও ৪০টি দোকানে।
এছাড়া চট্টগ্রাম কারাগারে চিকিৎসার অভাবে লাল ত্লেং কিম বম (৩০) নামের এক পাহাড়ি যুবক অসুস্থ হয়ে মারা যান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ৮১টি ঘটনা, জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ১১টি, ঘরবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ৪৯টি, প্রতিমা ভাঙচুর ৫২টি, মন্দিরে চুরির ১২টি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখল ৬টি, ককটেল বিস্ফোরণ ৪টি, ধর্মীয় উৎসবে বাধা ও হয়রানি ৫টি, উপাসনালয়ে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ ১০টি ঘটনা ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন। একজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে একজনকে।
জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ১১টি ঘটনার মধ্যে ৭টি ঘটনায় বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, দখল ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। একটি ঘটনা কারাগারে বম নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। একটি ঘটনায় পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী গ্রাফিতি বাদ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া একজন আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ, দুইজন আদিবাসী কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, একজন আদিবাসী কিশোরী ও একজন নারীকে ধর্ষণচেষ্টা এবং একজন আদিবাসী নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি, হতাহত, নির্যাতন ও আটক
২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ২৫ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বিএসএফ পিটিয়ে হত্যা করেছে ৬ জন বাংলাদেশিকে। ভারতীয় খাসিয়াদের গুলিতে ৪ জন বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হন।
বিএসএফ এর গুলিতে ১২ জন বাংলাদেশি নাগরিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, ৬ জন বিএসএফের নির্যাতনের শিকার এবং ১২ জন অপহৃত হয়েছেন।
অপরদিকে ১০ জন বাংলাদেশি ভারতীয়দের পিটুনির শিকার হয়ে মারা যান এবং আহত হন আরো ৩ জন।
এ বছর ভারতীয় কোস্টগার্ড নৌকাসহ ১০৯ জন বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে যায়। সীমান্ত এলাকা থেকে ১৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বিভিন্ন ধাপে অন্তত ৪ হাজার ৫৩১ জনকে বাংলাদেশের ভেতরে ‘পুশইন’ করে।
অপরদিকে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে একজন নিহত এবং ২১ জন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন। আরকান আর্মি নাফ নদী থেকে মাঝি মল্লাসহ বিভিন্ন দফায় মোট ২২২ জন বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
এমএসএফ এর সুপারিশ
দেশের মানুষ সমমর্যাদা, সাম্য ও ন্যায়বিচার লাভ করবে এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশায় এমএসএফ কয়কটি সুপারিশ করেছে।
• বিক্ষোভকারীদের দমনে ও সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করে হতাহতের ঘটনা কমিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সচেষ্ট থাকা।
• রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের ও এ সংক্রান্ত মামলায় গণগ্রেপ্তা করা থেকে বিরত থাকা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
• সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মব সন্ত্রাস বন্ধ করে সকল নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।
• গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্য পাওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রে নিরন্তর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং অবিলম্বে এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করা।
• গণমাধ্যম ও নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক সাইবার নিরাপত্তা সুরক্ষা অধ্যাদেশ বাতিল করা বা সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে পুনরায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা।
• আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
• আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা।
• কারাগারের অভ্যন্তরে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাসমূহের যথাযথ তদন্ত করে তার পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া।
• শিশু ও নারীদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি, নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা যে হারে ঘটছে, তাতে সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব, বিশেষ করে সমাজে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা আরও জোরদার করা।
• ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার চর্চায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতা রোধে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।
• পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
• সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করাসহ সমাজে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা আরও কার্যকর করা।
• গণপিটুনি/মব সন্ত্রাসের মত ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদারত্বের আওতায় রেখে তাদের কর্ম-পরিধি নিশ্চিত করা।
• ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।
• জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও আরও কার্যকর করা।
• দেশের নাগরিকদের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা রক্ষায় ও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ।