এ.এম.এমরান আহমেদ
অবিরাম বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পেকুয়া। কোথাও কোমর সমান পানি, কোথাও বিচ্ছিন্ন সড়কযোগাযোগ, আবার কোথাও পাহাড়ধসের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে হাজারো মানুষের।
গত শুক্রবারে অন্যদিনের চাইতে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও বন্যার পানি কমছেনা। বৃষ্টি হলেই সাথে সাথে আরও পানি বৃদ্ধি পায়।
ইতিমধ্যে মিনহাজ নামের ৮ বছর বয়সী এক শিশু পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপা পড়ে প্রাণহানি ঘটেছে, পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে অন্তত লক্ষাদিক মানুষ। পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। চালু করা হয়েছে কন্ট্রোল রুম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে মাইকিং ও করা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিনও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ২০ - ২৫ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া পৌরসভা, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, শিলখালী, টইটং ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা।
বহু পরিবার ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে গেছে ।
অনেক গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন জনপদ।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বহু বসতঘরে পানি ঢুকেছে। হাঁটু থেকে কোমরপানিতে ডুবে গেছে অসংখ্য গ্রাম। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিভিন্ন এলাকায় ব্যাহত হয়েছে। টানা বৃষ্টিতেই অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, স্বল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিনও ভারি বর্ষণের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ নরম হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি খাল-নালা উপচে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
টইটং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। পাহাড়ঘেঁষা হাজারো পরিবার এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলার উজানটিয়া, রাজাখালী, মগনামা, টৈটং, শিলখালী, বারবাকিয়া ও সদর ইউনিয়নের অনেক এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কার করা না হলে জোয়ারের পরবর্তী ঢলে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা জরুরি ভিত্তিতে ভাঙা বাঁধ মেরামত, পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
পেকুয়া সদরের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহেদুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টির মধ্যে গত বুধবার সকাল থেকে মেহেরনামায় কোন অংশে যেন বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে না যায় অনেক চেষ্টা করছি। কিন্তু অবশেষে বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে পেকুয়াসহ পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে গেছে । এতে শতশত ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়।
উপজেলা দুর্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কাউসার আহমেদ জানান, সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলার ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে এবং উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত ত্রাণের চাহিদা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ঢেউটিনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।