লোকসান আর বৈরী আবহাওয়ার ধাক্কায় বিপাকে পড়া উপকূলের ৪০ হাজার লবণচাষির জন্য আশার বার্তা হয়ে এসেছে সরকারের নতুন উদ্যোগ। দেশে লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আমদানি কমানো এবং উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। চাষিদের প্রত্যাশা, সরকারের এ আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়ন হলে লবণ শিল্পে আবারও স্বস্তি ফিরবে।
কক্সবাজার উপকূলে এখন শেষ সময়ের লবণ উৎপাদন চলছে। আগামী শুক্রবার (১৫ মে) শেষ হচ্ছে চলতি মৌসুমের লবণ উৎপাদন কার্যক্রম। মৌসুম শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে মাঠজুড়ে চলছে লবণ সংগ্রহের ব্যস্ততা। তবে এরই মধ্যে বৃষ্টির কারণে অনেক চাষি মাঠ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মৌসুমের শুরু থেকেই কম দামের কারণে বিপাকে পড়েন চাষিরা। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় এবার প্রায় ১ হাজার ৫০০ একর জমিতে লবণ চাষ হয়নি। এতে উৎপাদনে নামেননি প্রায় দেড় হাজার চাষি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দেয়া তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছে।
মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৮০ থেকে ২৫০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম বলে দাবি চাষিদের। এর মধ্যেই বৈরী আবহাওয়ায় ২০ দিন উৎপাদন ব্যাহত হয়। গলে যায় প্রস্তুত লবণ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাঁধ ও ত্রিপল। চাষিদের দাবি, প্রতি কেজি লবণ উৎপাদনে খরচ ১০ টাকা হলেও তারা পাচ্ছেন মাত্র ৫ টাকা। ফলে বাড়ছে লোকসান ও অনিশ্চয়তা।
এমন পরিস্থিতিতে সোমবার (১১ মে) সচিবালয়ে দেশের লবণ শিল্প নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানির যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বিসিকের চেয়ারম্যান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ সচিব এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে লবণ চাষের আওতাভুক্ত জমির পরিমাণ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দেশে কীভাবে লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যায় এবং লবণচাষিদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে লবণের চাহিদা অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন সময়ে লবণ আমদানির যৌক্তিকতাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। লবণচাষিরা যেন তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পান এবং দেশ লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে সেই লক্ষ্য নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
উপকূলের লাখো মানুষের জীবিকানির্ভর এই শিল্পে সরকারের উদ্যোগ নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে চাষিদের। চৌফলদণ্ডীর লবণচাষি রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে লবণ উৎপাদন করি। কিন্তু যে দাম পাই, তাতে খরচই ওঠে না। সরকার যদি ন্যায্যমূল্য ঠিক করে দেয়, তাহলে আমরা টিকে থাকতে পারব।’
একই এলাকার আরেক চাষি হামিদ হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টি আর খারাপ আবহাওয়ায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন মাঠে গর্তে অনেক লবণ মজুত রয়েছে। এখন একটা ভালো দামের আশা করছি।’
ইসলামপুর এলাকার লবণচাষি জসিম উদ্দিন এবং হায়দারপাড়ার লবণচাষি খালিদ হোসেন জানান, সরকারের পক্ষ থেকে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, এতে তারা আশাবাদী। সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলে তাদের লোকসান অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, ‘লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে নেয়া উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এবার ১ হাজার ৫০০ একরের বেশি জমিতে লবণ চাষ হয়নি, যা পুরো শিল্পের জন্য বড় সংকেত। তাই চাষিদের অগ্রাধিকার দিয়ে লবণ শিল্পের নীতিমালা সাজাতে হবে। পাশাপাশি শিল্প ও চাষিদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে লবণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।’
বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, ‘লবণচাষিদের প্রধান দাবি হচ্ছে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সরকার যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে চাষিরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। বর্তমানে মাঠে পর্যাপ্ত লবণ মজুত থাকায় এখন আমদানির প্রয়োজন নেই। মৌসুম শেষে জাতীয় লবণ কমিটি চাহিদা, মজুত ও শিল্প খাতের প্রয়োজন বিশ্লেষণ করে আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’ ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমি লবণ চাষের আওতায় আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কম দাম আর লোকসানের চাপের মধ্যেও থেমে নেই উপকূলের লবণচাষিরা। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা, সরকারের আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়ন হোক আর সাদা লবণের মাঠে ফিরুক স্বস্তির হাসি।