কক্সবাজারের চাঞ্চল্যকর সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলায় ৪ জন আসামিকে মৃত্যুদন্ড ও ৯ জন আসামীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড, একইসাথে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড, অর্থদন্ড অনাদায়ে আরো এক বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে ৫ জন আসামীকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে। বুধবার (২০ মে) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ রায় ঘোষণা করেন। ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর মাত্র এক বছর ৭ মাস ২৬ দিনের মধ্যে চাঞ্চল্যকর মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়।
কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের জেলা নাজির বেদারুল আলম এ তথ্য জানিয়েছেন। বাদী পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও রাষ্ট্র পক্ষে একই আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী মামলাটি পরিচালনা করেন।
মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত আসামীরা হলেন, হেলাল উদ্দিন, পিতা : জাফর আলম, নুরুল আমিন প্রকাশ আমিন, পিতা : মৃত কামাল হোসেন, নাছির উদ্দিন, পিতা : আবদুল মালেক এবং মোর্শেদ আলম, পিতা : আবুল কালাম। তারা প্রত্যেকের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। এদের মধ্যে দন্ডিত আসামী মোর্শেদ আলম পলাতক রয়েছে। অন্য আসামীরা রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিতরা হলেন : জালাল উদ্দীন প্রকাশ বাবুল, পিতা : নুরুল কবির, মোহাম্মদ আরীফ উল্লাহ, পিতা : মৃত শহর মুল্লুক, মো: আনোয়ার হাকিম, পিতা : আকতার আহমদ, মো: জিয়াবুল করিম, পিতা : মোজাফফর আহমদ, মো: ইসমাইল হোসেন প্রকাশ হোসেন, পিতা : নুরুল আলম, এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, পিতা : মৃত নুরুল আলম, মোহাম্মদ এনাম, পিতা : নুরুল ইসলাম, মো: কামাল প্রকাশ বিন্ডি কামাল, পিতা : নুরুল আলম মিস্ত্রি এবং আবদুল করিম প্রকাশ মো: মোহাম্মদ করিম, পিতা : গোলাম কাদের। তারা প্রত্যেকের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। এদের মধ্যে আবদুল করিম প্রকাশ মো: মোহাম্মদ করিম পলাতক রয়েছে। অন্য আসামীরা রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ :
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে সশস্ত্র ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩)। এ ঘটনার পরদিন ২৫সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় ডাকাতির প্রস্তুতিসহ একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার এসটি মামলা নম্বর : ৩১৩/২০২৫ ইং।
বিচার ও রায় :
চকরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী এই হত্যা মামলায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতে হত্যা মামলাটির অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করা হয়। মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামীপক্ষে তাদের জেরা, আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আসামীদের পক্ষে সাফাই সাক্ষী গ্রহণ, রাষ্ট্র পক্ষে তাদের জেরা, আলামত প্রদর্শন ও পর্যালোচনা সহ বিচারের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মামলাটি রায়ের জন্য বুধবার দিন ধার্য্য করা হয়। ধার্যদিনে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী ফৌজদারী দন্ডবিধির ৩০২/৩৯৯ ধারায় দোষী সাব্যস্থ করে আসামী হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন প্রকাশ আমিন, নাছির উদ্দিন ও মোর্শেদ আলমকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। এছাড়া, আসামী জালাল উদ্দীন প্রকাশ বাবুল, মোহাম্মদ আরীফ উল্লাহ, মো: আনোয়ার হাকিম, মো: জিয়াবুল করিম, মো: ইসমাইল হোসেন প্রকাশ হোসেন, এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, মোহাম্মদ এনাম, মো: কামাল প্রকাশ বিন্ডি কামাল, ও আবদুল করিম প্রকাশ মো: মোহাম্মদ করিমকে ফৌজদারী দন্ডবিধির ৩৯৯/৪০২ ধারায় দোষী সাব্যস্থ করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড, একইসাথে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড, অর্থদন্ড অনাদায়ে আরো এক বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত।
একই ঘটনায় চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে একই আসামীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরও একটি মামলা দায়ের করেন। যার স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল (এসপিটি) মামলা নম্বর : ৫২/২০২৫ ইংরেজি। একইদিন কক্সবাজারের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এ মামলাটিরও রায় ঘোষণা করেন। রায়ে উপরোক্ত হত্যা মামলায় দন্ডিত ১৩ জন আসামীর প্রত্যেককে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে ১৯(এ) ধারায় দোষী সাব্যস্থ করে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড, একইসাথে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে ১৯(এফ) ধারায় দোষী সাব্যস্থ করে প্রত্যককে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন।
উভয় মামলার চার্জশীট ভূক্ত ৫ জন আসামী যথাক্রমে, আসামী মোহাম্মদ ছাদেক, পিতা : খায়রুজ্জামান, আনোয়ারুল ইসলাম, পিতা : বাট্টাইয়া, শাহ আলম, পিতা : আবদুল জলিল, আবু হানিফ, পিতা : ইব্রাহিম খলিল এবং মিনহাজ উদ্দিন, পিতা : আবদুল জলিল এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদেরকে উভয় মামলা থেকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। মামলা দায়ের করার মাত্র এক বছর ৭ মাস ২৬দিনে চাঞ্চল্যকর মামলা ২টি নিষ্পত্তি করা করা হয়।
নিহত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনের পরিবারের সদস্যরা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
নিহত লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি ৮২তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি লং কোর্সে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন।
ঘোষিত রায় নিয়ে বাদী পক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী, সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এ রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়। এ রায় বাস্তবায়ন হলে সমাজে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।