কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ; একদিকে বনভূমি, অন্যদিকে নাফ নদী-যেখানে একসময় স্থানীয়দের জীবিকা ছিল স্থিতিশীল, সেখানে টানা ৯ বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের প্রভাবে নেমেছে সংকটের ছায়া। আয়ের পথ সংকুচিত, ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের চলাচল বাড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে অপরাধ নিয়েও।
শনিবার (০২ মে) বেলা ১১টায় কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পালংখালী স্টেশনে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনসহ ৭ দফা দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। আর কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জানান, ২০২৭ সালকেই রোহিঙ্গাদের ‘গুডবাই ইয়ার’ করতে মিয়ানমারের সঙ্গে বসে কাজ করবে সরকার।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমি, যেখানে একসময় চাষাবাদ করে জীবিকা চলত স্থানীয়দের। নাফ নদী-মাছ আর কাঁকড়া শিকারেও ছিল তাদের আয়ের ভরসা। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা আগমনের পর গত ৯ বছরে সেই সব পথ প্রায় বন্ধ। বনভূমিতে বেড়েছে অপহরণসহ নানা অপরাধ, আর নাফ নদীতে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির ভয়ে নামাও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে আয়হীন হয়ে পড়েছে স্থানীয়রা, বঞ্চিত হচ্ছে সহায়তা ও কর্মসংস্থান থেকেও।
এই পরিস্থিতিতে ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। শনিবার সকালে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পালংখালীতে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে তাদের অবস্থান-দাবি, ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ৭ দফা বাস্তবায়ন।
উখিয়ার পালংখালীর স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করা কিছু রোহিঙ্গার কারণে স্থানীয়দের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। সীমান্তের কাছে প্রায়ই গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, যার প্রভাব বাংলাদেশ অংশেও পড়ে। তিনি অভিযোগ করেন, বাইরে বসবাসকারী কিছু রোহিঙ্গা অবাধে কাজ করে অর্থ উপার্জন করছে এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ ডাকাতি, মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে পুরো হোস্ট কমিউনিটিতে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, পালংখালীর মানুষ চারদিকে অনিরাপত্তার মধ্যে আছে। পশ্চিমে পাহাড়ে গেলে রোহিঙ্গাদের দ্বারা অপহরণের ঝুঁকি, আর পূর্বে গেলে আরাকান আর্মির সহিংসতা কিংবা ধরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তিনি অভিযোগ করেন, অপহরণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে এলাকাবাসীর চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ফরিদ আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা আসার পর পরিস্থিতি আগের মতো নেই। বর্তমানে ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমের কারণে অনলাইন জুয়া, মাদকসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর প্রভাবে স্থানীয় যুবসমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দ্রুত এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানান, যাতে তরুণরা এসব অপকর্ম থেকে দূরে থাকতে পারে।
এদিকে সচেতন মহলের অভিযোগ-বনভূমি উজাড় ও পাহাড় কেটে স্থায়ী আবাসনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের চেষ্টা প্রত্যাবাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে হবে-নইলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।
অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল হোসেন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা লক্ষ্য করছি- ইউএনএইচসিআরসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রমের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য বনভূমি উজাড় করে, পাহাড় কেটে স্থায়ী দ্বীতল আবাসন নির্মাণ করা হচ্ছে-যা তাদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ইঙ্গিত দেয় এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে আমরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছি। একই সঙ্গে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে আমাদের উদ্বেগ ও আপত্তির বিষয়টি অবহিত করেছি। আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, অবিলম্বে এই ধরনের স্থায়ী পুনর্বাসন প্রকল্প বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, আমরা আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব।
উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, সরকারের কাছে একটিই স্পষ্ট দাবি-রোহিঙ্গাদের তাদের নিজস্ব স্বদেশে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য সর্বোচ্চ তৎপরতা বাড়াতে হবে। উখিয়া-টেকনাফের মানুষ হিসেবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নানা কষ্ট ও চাপের মধ্যে বসবাস করছি। আমাদের এই বাস্তবতার কথা আমরা বারবার তুলে ধরেছি, কিন্তু এখনো তা যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি বলে আমরা মনে করি। আমরা আবারও জোর দিয়ে বলছি, যদি আমাদের এই ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে বাধ্য হয়ে এখানকার সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে বৃহত্তর আন্দোলন-সংগ্রামে নামবে-কারণ তখন আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকবে না।
এদিকে কর্মসূচিতে অংশ নেন কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। বক্তব্যে তিনি বলেছেন, স্থানীয়দের দাবি অবশ্যই গুরুত্ব পাবে এবং প্রতিটি জায়গায় তা তুলে ধরা হবে। উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, আর এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। মানুষ যেন স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদ করতে পারে, মাছ ধরতে পারে-সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং সবকিছু নিয়মের মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। পাশাপাশি, কোনো ধরনের গোলাগুলি সহ্য করা হবে না।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, ২০২৭ সালকে ‘গুড বাই রোহিঙ্গা’ হিসেবে দেখতে চান তিনি। তাঁর মতে, ওই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে একজন রোহিঙ্গাও আর থাকবে না-তাদের আমরা গুড বাই জানাব। সুতরাং যেভাবে হোক দ্বিপাক্ষিক কিংবা সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে বসে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার যাতে ফেরত যায় সেটা সরকার ব্যবস্থা করবে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
“এ লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং সবাইকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।”
মানববন্ধন কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এম.এ মোক্তার আহমদ, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এডিশনাল পিপি এড. রেজাউল করিম, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান, পালংখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হেলাল উদ্দিন মেম্বার, সাধারণ সম্পাদক শাহাব উদ্দিন চৌধুরী, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি শাহ আলম প্রমুখ।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। আর তার বিপরীতে স্থানীয় বাসিন্দা রয়েছে ৫ লাখের কাছাকাছি।