শহরের কলাতলীর পর্যটন জোন দিন দিন ঘিঞ্জি পরিবেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। কক্সবাজার পৌরসভার নবনির্মিত ড্রেনের উপর দুই হাজারের অধিক অবৈধ দোকান বসিয়ে ব্যবসার চালিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা। ফলে পর্যটকদের চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটছে। দিন দিন পৌরসভার পর্যটন জোনের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে। কলাতলির ১১ টি পয়েন্টে অন্তত দুই হাজারের অধিক অবৈধ দোকান বসিয়ে দৈনিক কোটি টাকার ব্যবসা করে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা।
রাজনৈতিক দলের নেতা, হোটেল মালিক, প্রভাবশালী কেউ বাদ যাচ্ছে না দখলদারিত্ব থেকে। ৪ কিলোমিটারের ফুটপাত ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ দখল হয়ে গেছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে কলাতলির ১১ টি পয়েন্টে পৌরসভার নবনির্মিত ফুটপাতের উপর চরম দখলদারিত্বের চিত্র পাওয়া গেছে। কক্সবাজার পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গেল এক বছরে নজরদারি না থাকায় অবৈধ দখল প্রতিযোগিতা দিয়ে বাড়ছে। অন্তত ৩ শতাধিক প্রভাবশালী ও হোটেল মালিক প্রতিযোগিতা দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করেছে। এসব স্থাপনা ভাড়া দিয়ে মাসে কোটি টাকার বেশি অবৈধ আয় করে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক শামীম আল ইমরান বলেন, 'অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। শীঘ্রই এ সমস্ত গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। উচ্ছেদ করা হবে ব্যাঙ্গের ছাতার মত গড়ে ওঠা এসব অস্থায়ী এবং স্থায়ী দোকান।'
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়- কক্সবাজার পৌরসভার কলাতলী হোটেল মোটেল জোনের পাঁচটি ব্লকের ফুটপাতে বসানো হয়েছে নান্দনিক টাইলস। কক্সবাজার পৌরসভা, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, কউক সৌন্দর্য বর্ধনে ফুটপাতের উপর বসিয়েছে এসব টাইলস। এই টাইলস বসানো ফুটপাতে প্রতিদিনই বাড়ছে স্থায়ী এবং অস্থায়ী স্থাপনা। কোথাও দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার, কোথাও দখল করে বসানো হয়েছে পালকি দোকান, আবার কোথাও কুলিং কর্নার, কয়েকটি স্পটে দেখা গেছে অস্থায়ী রেস্টুরেন্ট।
কলাতলীর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিপরীতে গণপূর্তের সীমানা থেকে আরম্ভ হয়ে সুগন্ধা পয়েন্টের শেষ পর্যন্ত গিয়ে রাস্তার পূর্ব পাশে ফুটপাতের উপর বসানো হয়েছে অন্তত ২ শতাধিক দোকান। মানুষ চলাচলের এই ফুটপাত সৌন্দর্য বর্ধন করা হলেও দখলদারিত্বের কারণে তা বুঝাই যাচ্ছে না। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পূর্ব দিকের গলিতে বসানো হয়েছে শতাধিক দোকান। দোকানগুলো থেকে চাঁদা আদায় করছে কয়েকজন প্রভাবশালী পাতিনেতা।
নিরিবিলি অর্কিডের বিপরীতে সাবেক তাহের ভবনের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে চলে যাওয়া গলিতে সড়কের উপর বসেছে দুই শতাধিক দোকান। অভিযোগ উঠেছে, দোকান থেকে প্রতিদিন ভাড়ার নামে চাঁদা আদায় করছে পাহাড়তলীর একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ফুটপাতের উপর প্রতিদিনই বসে দোকানগুলো। পিছনের গলিতে নতুন করে নির্মিত ড্রেনের উপর বিভিন্ন হোটেলের কিচেন এবং পানের দোকান এমনকি হোটেলের জেনারেটরগুলো বসানো হয়েছে উন্মুক্ত স্থানে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই এসব জেনারেটর চালু করলে কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় পর্যটন শহরের উক্ত সড়কের পরিবেশ।
হোটেল লং বীচের বিপরীতে মোহাম্মদিয়া গেস্ট হাউস সংলগ্ন পূর্ব দিকের গলিতে পৌরসভার ড্রেনের উপর বসানো হয়েছে শতাধিক দোকান। কেউ করেছে ফার্মেসী, কেউ কুলিং কর্নার, আবার অনেক প্রভাবশালী বসিয়েছে ছোলা মুড়ির দোকান। এসব অস্থায়ী দোকান পৌরসভার ড্রেনের উপর বসানোর কারণে লোকজন সড়ক দখল করে চেয়ার বসিয়ে অবৈর ব্যবসা করার কারণে যান চলাচল বিঘ্ন ঘটছে মারাত্মকভাবে। বিশেষ করে মোহাম্মদীয়া গেস্ট হাউজের সামনে দক্ষিণ পাশে এবং পূর্ব পাশে অন্তত ১২ টি দোকান অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করে মোটা টাকা সালামি গ্রহণ করে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বিনা বাধায়। গলির মুখের অপর হোটেল সেন্ট মার্টিনের সামনে পেছনে এবং উত্তর পাশে অন্তত দশটি দোকান অবৈধভাবে নির্মাণ করে মোটা টাকায় ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ তাদের নির্মিত ফুটপাতের উপর দোকান বসালেও কোন অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা মাসোহারার মাধ্যমে এসব দোকান বসানোর অনুমতি দিয়েছে। সেন্টমার্টিন হোটেলের পেছনের গলিতে পৌরসভার ট্রেনের উপর অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে হোটেল মালিক মোটা অংকের সালামি নিয়ে চায়ের দোকান, গ্যাস লাইন এবং এর সরঞ্জাম বসিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পিছনের গলিতে ড্রেনের উপর বসানো হয়েছে মাছরাঙ্গা রেস্তোরার জেনারেটর। জেনারেটরের বিকট আওয়াজ এবং কালো ধোঁয়ায় পুরো পরিবেশ বিপন্ন এবং পর্যটকদের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সারিতে মেজ্জান ডাইনসহ পাঁচটি রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের ময়লা আবর্জনা এবং গ্যাস লাইনগুলো পৌরসভার নবনির্মিত ড্রেনের উপর বসানোর কারণে পর্যটকদের চলাচল অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। ৫০০ মিটারের পৌরসভার ড্রেনের উপর বসেছে পাঁচটি জেনারেটর এবং গ্যাসলাইন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই একসাথে ১০-১২ টি জেনারেটর চালু করলে পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ফলে পর্যটকরা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে রুম বুকিং ছেড়ে বুকিং অন্যত্রে চলে যায় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন হোটেল মালিক।
সুগন্ধা পয়েন্টের পূর্ব পাশের গলিতে সৈকত পাড়া জামে মসজিদ পর্যন্ত ৫শ মিটারের জায়গায় অন্তত ৩'শ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ড্রেনের উপর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন প্রভাবশালী। পুরু ড্রেনজুড়ে বসানো হয়েছে রেস্তোরা, ফার্মেসি, ডাব বিক্রির দোকান বিভিন্ন দোকানগুলো। দৈনিক মোটা টাকার অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সৈকত আবাসিক এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী চক্র। কক্সবাজার পৌরসভা সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য এসব নির্মান করা হলেও কার্যত অবৈধ দখলদারের হাতে চলে গেছে ড্রেন।
কলাতলীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হোটেল সি প্যালাসের বিপরীতের গণপূর্ত পার্কের উত্তর এবং দক্ষিণ গলিতে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা। দিন দুপুরে অবৈধ স্থাপনা তুলে লক্ষ লক্ষ টাকার অবৈধ বাণিজ্য করে গেলেও পৌরসভার ঘুম ভাঙেনি। পৌরসভার ড্রেনের উপর এসব দোকান বসিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা চালালেও অদ্যাবধি কোন অভিযান পরিচালনা করা হয়নি অবৈধ দখল উচ্ছেদে। ফলে দিন দিন পৌরসভার ড্রেনের উপর অবৈধভাবে নির্মিত অস্থায়ী দোকানপাট বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুটুমবাড়ি রেস্তোরাঁ গলির পূর্ব দিকে বেড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। ৮-১০ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অবৈধ স্থাপনার উপর দোকান বসিয়ে দিব্যি ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছে বছরজুড়ে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা কক্সবাজার পৌরসভার কোন অভিযানিক দল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পুরো পর্যটন জোন ঘিঞ্জি পরিবেশে পরিণত হচ্ছে। অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে সংকুচিত হয়ে আসছে পর্যটন এলাকার সড়ক এবং উপসড়কগুলো।
কলাতলীর ডলফিন মোড়ে সড়কের উভয়পাশের উপর পৌরসভার ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অন্তত ৫ শতাধিক দোকান। কলাতলীর কয়েকজন প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ফুটপাতের উপর দোকান বসিয়ে দৈনিক লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সড়কের উপর এবং পৌরসভার ফুটপাতের উপর দোকান বসানোর কারণে প্রতিদিনই ঘটছে চাদাবাজির মতো ঘটনা। সড়ক সংকুচিত হওয়ার কারণে যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় সড়ক দুর্ঘটনায় হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। সড়কের উভয় পাশের ফুটপাত অবৈধ দখল উচ্ছেদে জরুরী ভিত্তিতেও অভিযান পরিচালনা করা সময়ের দাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলাতলীর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে থেকে ডলফিন মোড পর্যন্ত পৌরসভার দুই কিলোমিটার ড্রেনের উপর দুই হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলে দাবি পর্যটন ব্যবসায়ীদের। এসব অবৈধ স্থাপনার সাথে জড়িত কক্সবাজার পৌরসভার কর্মচারী ও সরকার দলীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। হোটেল মালিকগণ নিজেদের হোটেলের সামনের ফুটপাত দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণপূর্বক দূরপাল্লার বিভিন্ন বাস কাউন্টার, পানের দোকান, কুলিং কর্নার এবং বিকাশের দোকান বসিয়ে বিনা বাধায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব অবৈধ স্থাপনা দ্রুত সময়ের মধ্যে অপসারণ করা না হলে পর্যটন জোন প্রভাবশালীদের নাগালে চলে যাবে।
কক্সবাজার পৌরসভার ড্রেনের উপর অবৈধ স্থাপনা নির্মান এবং দখলমুক্ত করার বিষয়ে পৌরসভার প্রশাসক শামীম আল ইমরান বলেন - পৌরসভার ড্রেনের উপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা বদ্ধপরিকর। যারা ড্রেন দখল করে দোকান নির্মাণ করেছে তাদের চিহ্নিত করে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি এবং অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান শেষ করে চলে আসার পর পুনরায় প্রভাবশালীরা এসব ড্রেন দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেন। আমরা শীঘ্রই পুনরায় অভিযান পরিচালনা করব। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পর্যটকদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য অ্যাকশনে যাব।
তিনি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের পূর্বে নিজ নিজ দায়িত্বে সরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান।