আসন্ন ঈদুল আজহা (কোরবানি ঈদ ) নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে পশু ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন জায়গায় পশুর হাট বসানোর জন্যও প্রস্তুতি চলছে। এবারের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে
কক্সবাজারে পশুর খামারগুলোও বেশ জমজমাট অবস্থায় রয়েছে। তারা আগে থেকেই গরু বিক্রি করা শুরু করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে ক্রেতারাও আগে থেকেই পছন্দের পশু কিনে রাখছেন এসব খামার থেকে। কক্সবাজারে এবার চাহিদার তুলনায় কোরবানি পশু বেশি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তর।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র বলছে, জেলায় খামারের সংখ্যা ৮ হাজার ২৮৭ টি। এসব খামারগুলোতে প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৩ টি পশু। জেলায় কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯২ টি পশু এবং উদ্বৃত্ত রয়েছে ২৪ হাজার ৭৭১টি পশু।
খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুগুলোর মধ্যে ষাঁড় ৬৩ হাজার ১৩৯ টি, বলদ ২৪ হাজার ২৮৩ টি, গাভী ১৬ হাজার ৪৫১ টিসহ মোট গরুর সংখ্যা ১০ লাখ ৩৮ হাজার ৭৪টি। মহিষ ৬ হাজার ২৭৯ টি, ছাগল ৩৩ হাজার ৫৫২ টি, ভেড়া ১৪ হাজার ৪৬৩টি এবং অন্যান্য ১৫ টি পশু রয়েছে।
২০২৫ সালে তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় ঈদুল আজহা উপলক্ষে ছোট-বড় মিলে কোরবানি পশুর হাট ৯৪টি। তারমধ্য স্থায়ী হাট ৪৮টি এবং অস্থায়ী হাট ৪৬ টি। জেলায় এখনো কোরবানির হাটের ডাক হয়নি।
ঈদগাঁও রশিদ নগর ইউনিয়নের খামারি শহিদুল ইসলামের ছোট-বড় ২০ টি পশু রয়েছে। তারমধ্যে ষাঁড় ১১ টি বলদ ৯টি।
তিনি বলেন, 'গত বছর তার খামারে ৩৯ টি গরু ছিল। গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত হয়েছে গেছে গরুর সংখ্যা। এছাড়া দিন দিন খামারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এইবারে গরুর সংকট থাকবে; একারণে গত বছরের তুলনায় এই বছর গরুর দাম বেশিহবে।'
রশিদ নগর ৭ নং ওয়ার্ড, পূর্ব নুনাছড়ি ডালিম ও শাকিলের জানান, তাঁদের যৌথ খামারে বর্তমানে ৫০ টির মত গরু রয়েছে। তাঁদের খামারে সর্বোচ্চ ৮ লাখ এবং সর্বনিম্ন ৩ লাখ টাকার নিচে গরু নেই বলে জানিয়েছেন ডালিম। তিনি বলেন, 'গত বছরের চেয়ে এ বছর গো-খাদ্য গম, ভূট্ট ভাঙা, খৈল ও ভূষিসহ সুষম দানাদার খাবার মণপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা বৃদ্ধি বেড়েছে। এতে এ বছর গরু মোটাতাজা করতে খরচও বেশি হয়েছে। একারনে গরুর দাম বেশি হতে পারে।'
তারা বলেন, 'হাটে গরুর ন্যায্য মূল্য না পেলে উৎপাদন খরচও উঠবে না, ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমাদের নিজস্ব পুঁজি নেই যে গরুগুলো পুনরায় পালন করবো, তাই লোকসান দিয়ে হলেও বিক্রি করতে হবে।'
রামু উপজেলার কচ্চপিয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের বড় জংছড়ি এলাকার খামারি হেলাল উদ্দিন বলেন, 'ছোট-বড় মিলে তার খামারে ১৫ টি গরু আছে। ৫ টি গরু বাজারে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছে। ৫ মন ওজনের একটি গরু ( ষাঁড় ) ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা তিনি দাম দিয়েছেন। ৩ থেকে ৪ মন ওজনের গরু ১ লাখ ১০ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে বলে তিনি আশাবাদী।'
উখিয়া উপজেলার খুনিয়া পালং ২ নং ওয়ার্ডের জাকির হোসেন বলেন, 'অভাব-অনটনের কারনে গত মাসে তিনটি গরু বিক্রি করেছি। দেড় মন ওজনের একটি ষাঁড় ৫৫ হাজার, দুই মন ওজনের একটি বলদ ৭৫ এবং আরেক'টি ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, আগের মত এখন পরিত্যক্ত খিল জমি নেই; ঘাসও আগের মত নেই ; খাদ্যের দামও বাড়তে আছে, এ অবস্থায় গরু লালন-পালন কঠিন হয়ে পড়েছে।'
বিভিন্ন খামার মালিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় পর্যাপ্ত পশু মওজুদ আছে। কোন রকম ঘাটতি নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেপারিরা গরু কিনতে আসলে দাম বাড়বে। এছাড়া গো-খাদ্যের দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতি বস্তায় ৩০০-৪০০ টাকা বেড়েছে। শ্রমিকের বেতন, কিস্তির টাকা, খাদ্যের দাম নিয়ে লোকসানের আশা করছেন তারা। মূলত, ফিড তৈরির কাঁচামালের দামের অস্থিরতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, এবং খামারের খাবারের উচ্চ চাহিদার কারণেই দাম বেড়েছে এইবারের কোরবানি পশুর।
২০২৬ সালের মে মাসের বাজার দর অনুযায়ী, গো-খাদ্যের দাম বেশ চড়া। ভুট্টার গুঁড়া ৪৫-৫০ টাকা, গম ভাঙা ৫২-৫৫ টাকা, গমের ভুষি ৫৮-৬৫ টাকা, এবং খৈল (সরিষা/সয়াবিন) ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া, ব্র্যান্ডের ক্যাটল ফিডের ২৫ কেজির বস্তা ১১০০-১৩০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে এবং স্থান ও ব্র্যান্ডভেদে দাম কম-বেশি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় পশুর জোগান পর্যাপ্ত থাকলেও খাদ্য ও লালন-পালনের খরচ বাড়ায় পশুর দাম কিছুটা বেশি থাকতে পারে। প্রতি বছরের মত এইবারেও মাঝারি গরু বেশি বিক্রি হবে। দুই থেকে তিন মন ওজনের গরুর চাহিদা বেশি। দাম নিয়ে খামারিয়া অপেক্ষা করলে লাভের চেয়ে লোকসানের আশংকা রয়েছে। কারণ, বড় গরুর প্রতি মানুষের চাহিদা কম।
বাজার বিশ্লেষক ও কোরবানিদাতাদের কেউ কেউ বলছেন, গরুর দাম এতটাই বেড়েছে যে অনেকে হয়তো কোরবানি দিতে পারবেন না। কেউ কেউ অতীতে একটি গরু কোরবানি দিতেন, এখন দেন ভাগাভাগি করে। কেউ কেউ গরুর বদলে ছাগল কোরবানি দিচ্ছেন।
কোরবানি দাতা বাহারছড়া এলাকার আবুল শামা বলেন, 'এখনও বাজারে যায়নি ; খবর নিয়ে জানতে পারলাম, গরু/ মহিষের দাম অনেক বেশি।"দ'
পূর্ব কলাতলী এলাকার হাসান আলি বলেন, 'একটি বলদ গরু পছন্দ করে রেখেছি। ৬ মন ওজন হবে। দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, এই সাইজের গরু কয়েক বছর আগে দুই লাখের মধ্যে পাওয়া যেতো।'
এদিকে কক্সবাজার জেলায় এখনো পর্যন্ত কোরবানি হাটের (অস্থায়ী) কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। দুই এক দিনের মধ্যে কোরবানি পশুর হাট ডাক উঠবে বলে জানা যায়।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা : এ, এম, খালেকুজ্জামান দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। আট উপজেলায় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৩ টি কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পশুর চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯২ টি পশু এবং উদ্বৃত্ত রয়েছে ২৪ হাজার ৭৭১টি পশু।'
গো-খাদ্যের দাম নিয়ে তিনি বলেন, 'গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করতে খরচ বেড়েছে বলে খামারিরা বলছেন। আমরা খামারিদের পরামর্শ দিয়েছি, কাঁচা ঘাঁস ও খড় বেশি পরিমাণ খাওয়ানোর জন্য। এতে কিছু খরচ কমবে।'
তিনি আরও বলেন, 'কেউ ক্ষতিকর পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ও প্রতিটি পশুর হাটে মেডিকেল টিম থাকবে যেন কোনো অসুস্থ পশু বিক্রি হতে না পারে।'
পুলিশ সুপার এ. এন. এম সাজেদুর রহমান বলেন, 'এবারে কোরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা জোরদার করার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত ও চুরি ছিনতাই রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'