সাইফুল আফ্রিদি
শিশু, কিশোর-কিশোরী ও রোহিঙ্গা সহ কক্সবাজারে বসবাসরত প্রায় ৫০ লাখ জনগনের সেবার জন্য ১ হাজার ৫৫৮ জন পুলিশ কর্মরত রয়েছে। দেশে ইয়াবা, আইস ও মানবপাচারের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটি হিমশিম খাচ্ছে। এইজন্য পর্যটন শহর, বিশ্বের বৃহত্তম শরনার্থী শিবির সহ বিশাল সীমান্তের বিষয়টি মাথায় রেখে জেলা পুলিশের জনবল বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি সহ আইনজীবিরা। আর বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে কথা বলার আশ্বাস দিলেন সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী।
২ হাজার ৪৯১ বর্গকিলোমিটারের কক্সবাজার জেলার ১০ টি উপজেলায় ভোটার রয়েছে ২৮ লাখ ২৩ হাজার ২৬৮ জন। এর সঙ্গে উখিয়া-টেকনাফের ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এবং প্রতিদিনের পর্যটকের চাপ। ১৮ বছরের নিচে থাকা শিশু কিশোরসহ সব মিলিয়ে কক্সবাজারে জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এর বিপরীতে সেবার জন্য জেলা পুলিশের জন্য মঞ্জুরীকৃত জনবল ১ হাজার ৬৭৫ জন। কর্মরত আছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন। পুলিশের হিসাবেই শূন্যপদ রয়েছে ১৮০টি। অর্থাৎ মঞ্জুরীকৃত জনবলের চেয়েও বাস্তবে মাঠে থাকা পুলিশ সদস্যের সংখ্যা কম।
অর্ধকোটি মানুষকে ১ হাজার ৫৫৮ জন কর্মরত পুলিশ সদস্য দিয়ে হিসাব করলে গড়ে একজন পুলিশ সদস্যের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ২০৯ জন মানুষ পড়ে। শুধু জেলার স্থানীয় জনসংখ্যা ধরলে এ অনুপাত প্রায় ১ হাজার ৮১৩ জনে একজন।
এই জনবল দিয়েই পুলিশকে জেলার বিভিন্ন থানা, তদন্তকেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, সড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, ভিআইপি প্রটৌকল, রাজনৈতিক প্রোগামের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি রিজার্ভ পুলিশও রয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার, আদালতের পরোয়ানা তামিল, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও জেলা পুলিশের। এর বাইরে ভিআইপি প্রটোকল, ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রটোকল এবং আদালতে নিয়মিত পাহারার দায়িত্বও রয়েছে। ফলে মামলার তদন্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, সদর থানায় বর্তমানে ৭২ জন কনস্টেবল, ২২ জন সাবইন্সপেক্টর (এসআই), ২০ জন সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই) এবং ৩ জন ইন্সপেক্টর কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া শহর পুলিশ ফাঁড়িতে ১ জন ইন্সপেক্টর, ২ জন এসআই, ৩ জন এএসআই এবং ১৭ জন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করছেন।
মানবপাচার, অপহরণ, দস্যুতা, সীমান্ত চোরাচালান ও মাদকসহ নানা ধরনের অপরাধের মামলাও সামলাতে হচ্ছে এই জনবল দিয়ে। আইনশৃঙ্খলার কোনো বিঘ্ন ঘটলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের ওপরই এর বড় অংশের দায় এসে পড়ে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে কক্সবাজারে বিভিন্ন অপরাধে ৩ হাজার ৩৯৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে খুনের মামলা ৯৭টি, ডাকাতি ১৪টি, দস্যুতা ২৩টি, চুরি ১৬০টি, অপহরণ ৪৭টি, মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলা ১ হাজার ৪৯টি এবং চোরাচালানের মামলা ১০২টি।
মহেশখালী পাহাড় ও সাগরবেষ্টিত দ্বীপ। এই দ্বীপে জলদস্যু, ডাকাতি, সন্ত্রাসীরা এ দ্বীপকে আশ্রয়স্থল হিসেবে নেয়। দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা দমনে একমাত্র থানার পুলিশকেই তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখতে পারে। মহেশখালী থানার ওসি আব্দুস সোলতান বলেন, মাতারবাড়িতে নতুন থানা এবং কালারমারছড়ায় তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। মহেশখালীতে ৭০ জনের মতো পুলিশ কাজ করছে। ওই থানা ও তদন্তকেন্দ্র চালু হলে অপরাধ আরও কমবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বিশেষ করে মাদক ও সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের কারণে উখিয়া-টেকনাফসহ জেলার কয়েকটি এলাকায় পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। দুই উপজেলায় স্থানীয় বাসিন্দা প্রায় ৫ লাখ ৯৭ হাজার। এর বাইরে ক্যাম্পগুলোতে রয়েছে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
৬৫০ দশমিক ৪৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উখিয়া-টেকনাফে স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা মিলিয়ে ২৫ লাখের বেশি মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত জেলা পুলিশের সদস্য সংখ্যা ২০০-এর কাছাকাছি। এই হিসাবে সেখানে একজন জেলা পুলিশ সদস্যের বিপরীতে পড়ছে ১২ হাজারের বেশি মানুষ।
উখিয়া থানার ওসি মো. আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, উখিয়া-টেকনাফে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবীসহ প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি জনসংখ্যা। উখিয়া থানায় ৭০ জনের মতো পুলিশ কাজ করছেন। মাসে গড়ে ৭০ থেকে ৯০টি মামলা হয়। একজন তদন্ত কর্মকর্তার কাঁধে প্রায় ৩০টি মামলার ভার পড়ে।
তিনি বলেন, থানার অধীনে ইনানী ও বালুখালী দুটি ফাঁড়ি রয়েছে। এসব ফাঁড়ি আধুনিকীকরণের জন্য মাননীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ডিও লেটার দিয়েছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এপিবিএন কাজ করছে। তারপরও অপরাধ তদন্ত ও মামলার সবকিছু জেলা পুলিশকে দেখতে হয়। কিছু মামলা এপিবিএনও তদন্ত করে পুলিশকে সহযোগিতা করে। জনবল নিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হলেও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে সর্বোচ্চ কাজ করা হচ্ছে।
টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, থানায় ১০০ জনের মতো জনবল রয়েছে। সীমান্ত থানা হিসেবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই জনবল দিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হয়। মাসে ১২০ থেকে ১২৫টি মামলা হয় টেকনাফে। এতে পুলিশের কর্মঘণ্টাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, জনবল বাড়ানোর জন্য কচ্ছপিয়া ও হোয়াইক্যং তদন্তকেন্দ্রের বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব তদন্তকেন্দ্র হয়ে গেল সীমান্ত উপজেলার পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় অবশ্য আলাদাভাবে কাজ করছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। টেকনাফের সাতটি ক্যাম্পে ১৬ এপিবিএনের ৪৬৩ জন, উখিয়ার ১১টি ক্যাম্পে ৮ এপিবিএনের ৪৫০ জন এবং ১৪ এপিবিএনের ৪৫০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্ত ও উপকূলীয় নিরাপত্তায় বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীরও আলাদা দায়িত্ব রয়েছে।
তবে এসব বাহিনীর নিজস্ব দায়িত্বের বাইরে জেলা পুলিশের মামলা ও তদন্তের চাপ কমছে না। পুলিশের সংশ্লিষ্টরা জানান, টেকনাফ থানায় মাসে ১২০ থেকে ১২৫টির বেশি মামলা রেকর্ড হয়। একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে একই সময়ে ৩০ থেকে ৪০টির বেশি মামলা তদন্ত করতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ। অর্থাৎ সীমান্ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পর্যটনকেন্দ্র ও বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি নিয়মিত মামলা-তদন্ত, আদালত পাহারা, ভিআইপি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রটোকল সবই সামলাতে হচ্ছে জেলা পুলিশের একই জনবলকে।
পুলিশের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলা ও আইনশৃঙ্খলাজনিত দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রটোকল ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে একজন কর্মকর্তার হাতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মামলা থাকায় প্রতিটি মামলার তদন্তে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলার তদন্তেও।
২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্নাপালং গ্রামের কুয়েত প্রবাসী রোকেন বড়ুয়ার বাড়িতে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডে নিহত ৪ জন হলেন প্রবাসীর মা সখী বড়ুয়া (৭০), প্রবাসীর স্ত্রী মিলা বড়ুয়া (২৫), প্রবাসীর সাত বছর বয়সী শিশুকন্যা রমি বড়ুয়া এবং পাঁচ বছর বয়সী শিশুপুত্র রিপন বড়ুয়া। এই লোমহর্ষক ঘটনার পর পুলিশ ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দীর্ঘ তদন্ত পরিচালনা করলেও আজ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর সুনির্দিষ্ট কারণ বা প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পুলিশের দেওয়া তথ্যেও ২০ টি মামলার কারণ এখনো অজানা উল্লেখ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের স্থানীয় জনসংখ্যার সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, পর্যটনকেন্দ্রিক মানুষের চলাচল, সীমান্ত ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধ সব মিলিয়ে পুলিশের দায়িত্বের পরিধি বড় হয়েছে। এর সঙ্গে নিয়মিত প্রটোকল ও আদালতকেন্দ্রিক দায়িত্ব যুক্ত হওয়ায় জেলা পুলিশের নিজস্ব জনবল ও দায়িত্বের মধ্যে সামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) অহিদুর রহমান বলেন, “কক্সবাজারে অন্যান্য বাহিনী যেভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে, সেভাবে পুলিশের জনবল কিংবা শক্তি বাড়েনি। তারপরও জনসংখ্যার তুলনায় অল্প জনবল দিয়ে আমরা কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছি।” এই জেলা অপরাধের দিক চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার সমতুল্য। কিন্তু এই জেলার পুলিশকে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার মত সাজানো হয়নি।
কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভায় পুলিশের পরিবর্তন এবং তাদের বেতন-ভাতা কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে পুলিশের কাঠামোগত পরিবর্তন হয় না। পুলিশের পরিবর্তন করতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ, সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন ও চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী পুলিশকে মডিফাই করা হয়নি।
কক্সবাজার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী বলেন, আজ জেলার আইনশৃঙ্খলার বৈঠক রয়েছে। সেখানে আমি থাকব। বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে কথা হবে।