দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের নিরাপত্তা বলয় জোরদার, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত রাখতে নজিরবিহীন সফলতা দেখিয়েছে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৫৯ দিনের এক বিশেষ মেগা ড্রাইভে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত মোট ১ হাজার ৫৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে শহর ও শহরতলির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পৃথক ও জোরালো অভিযান চালিয়ে ১৯৬ জন সদস্যকে আটক করে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশের এই বিশাল আভিযানিক সফলতায় পর্যটন নগরীজুড়ে সাধারণ নাগরিক ও ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে গভীর স্বস্তি ও বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ্বখ্যাত এই পর্যটন নগরীর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে সড়ক ও গলির অপরাধ, যেমন চুরি ও ছিনতাই রোধ এবং মাদকের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার ওপর। ৫৯ দিনের এই টানা অভিযানে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে পেশাদার চোর ও ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে। পুলিশ এক হাজার ৫৯ জন আসামির মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬০ জন চোর ও ছিনতাইকারীকে সরাসরি হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর পাশাপাশি মাদকের বিস্তার রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করে পুলিশ। অভিযানে ৮৬ জন চিহ্নিত তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩১৪ জন মাদক সেবনকারীসহ মোট ৪২৬ জন মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদকের মতো প্রাণঘাতী ব্যাধির বিরুদ্ধে পুলিশের এই কঠোর অবস্থান স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
অভিযানের পরিধি কেবল মাদক বা ছিনতাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং পুরোনো জট কাটাতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আদালতের পরোয়ানা তামিল ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযানে দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা আদালতের ১৮৪ জন পরোয়ানাভুক্ত (ওয়ারেন্ট) আসামি, বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত নিয়মিত মামলার ৩৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সাথে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা, মোড়ে মোড়ে আড্ডা ও অসামাজিক কার্যকলাপের দায়ে দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় ৫২ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়। অন্যদিকে, কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষ পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা যায়, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও সদর থানার সমন্বিত উদ্যোগে আটক ৪৭৪ জন কিশোরের মধ্যে ২৭৮ জনকে অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সতর্কতামূলক মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকায় ১৯৬ জনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের এই নগরীতে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার দেশি-বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটে। তাঁদের সার্বিক জানমালের নিরাপত্তা, নির্ভাবনায় চলাচল এবং শহরের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে সদর থানা পুলিশের এই ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখছে। শহরজুড়ে পুলিশের দৃশ্যমান টহল, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চেকপোস্ট স্থাপন এবং আকস্মিক তল্লাশির ফলে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
সদর মডেল থানার অফিসার ইন-চার্জ মোহাম্মদ আলী স্পষ্ট জানিয়েছেন, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মাটিতে কারো ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। চোর, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি কিংবা উঠতি কিশোর গ্যাং- সব ধরনের অপরাধ চক্রের মূল উৎপাটন না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশের এই বিশেষ ও জরিমানা-অসহিষ্ণু (জিরো টলারেন্স) অভিযান ভবিষ্যতেও পূর্ণ গতিতে অব্যাহত থাকবে। গ্রেপ্তারকৃত সকল আসামির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।